নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল: এক ব্যবসায়ীর প্রায় কোটি টাকা মূল্যের ৪০ ভরি স্বর্ণ ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পুলিশে কর্মরত কনস্টেবল জাকির হোসেনকে পুলিশ অফিসার্স মেস থেকে পুলিশ লাইনে প্রত্যাহার করা হয়েছে। শনিবার তাকে প্রত্যাহার করে লাইনে ক্লোজ করা হয়। অন্যদিকে স্বর্ণ ছিনতাই ঘটনাটি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইয়াসির আরাফাতকে।

এদিকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইয়াসির আরাফাত জানিয়েছেন, কনস্টেবল জাকির হোসেন ঘটনার পরপরই এক মাসের ছুটি নিয়ে গ্রামের বাড়ি রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার দেবীপুরের শ্যামপুর গ্রামে চলে যান। কয়েক দিন আগে ছুটি শেষে কর্মস্থলে যোগ দেন। এরই মধ্যে বিভিন্ন মাধ্যমে স্বর্ণ ছিনতাইয়ের বিষয়টি অবগত হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুলিশ সুপার মহোদয় তাকে অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছেন। তিনি ইতোমধ্যে তদন্ত কাজ শুরু করেছেন। আগামী ১০ কার্যদিবসের মধ্যে পুলিশ সুপার বরাবর তিনি প্রতিবেদন জমা দেবেন।

ঘটনার অভিযোগে জানা গেছে, গত ৮ আগস্ট রাজশাহীর স্বর্ণ ব্যবসায়ী নিঝুম ৪০ ভরি স্বর্ণ চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক ব্যবসায়ীর কাছে পৌঁছে দিতে আপন ভগিনীপতি মোহাম্মদ আলীকে ঘটনাস্থলে পাঠান। মোহাম্মদ আলীর বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের চকআলমপুর গ্রামে। মোহাম্মদ আলী ওই দিন বিকাল ৩টার দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার কালিনগর ব্রিজের কাছে মরাপাগলা নদীর মোহনায় পৌঁছলে কনস্টেবল জাকির হোসেনসহ দুই ব্যক্তি সাদা পোশাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে স্বর্ণগুলো ছিনতাই করেন।

এলাকাবাসী জানান, যেখানে স্বর্ণ ছিনতাই হয়েছে জায়গাটি সীমান্তের কাছে। এই পথ দিয়ে ভারতে স্বর্ণ পাচার হয়ে থাকে।

এদিকে ঘটনার পর রাজশাহীর ব্যবসায়ী নিঝুম অভিযোগে জানান, পূর্বপরিকল্পনা মোতাবেক তার দুলাভাই মোহাম্মদ আলী ও ভাগনে মো. নয়ন পুলিশ সদস্য জাকিরকে ব্যবহার করে স্বর্ণগুলো ছিনতাই করান। ঘটনার পর তিনজন মিলে স্বর্ণগুলো ভাগ-বাটোয়ারা করে নেন। এরপরই জাকির এক মাসের ছুটি নিয়ে গ্রামের বাড়িতে চলে যান।

এদিকে ঘটনার পর চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর থেকে কালীনগর ব্রিজ পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন স্থানের ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেন নিঝুম। এতে দেখা যায়, ঘটনার কয়েক মিনিট আগে কনস্টেবল জাকির তার নিজের ব্যবহৃত অ্যাপাচি মোটরসাইকেলে দুজনকে নিয়ে ব্রিজের দিকে যাচ্ছেন। মোটরসাইকেলে জাকিরের সঙ্গে অপরজন কে ছিলেন তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এরপরই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ কনস্টেবল জাকির হোসেন সেদিন কালীনগর ব্রিজের দিকে যাওয়ার কথা স্বীকার করেন। তবে এমনিই তিনি ওই এলাকায় গিয়েছিলেন বলে দাবি করেন। আর এ ঘটনায় নিজের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলেও তিনি দাবি করেছেন।

জাকির বলেন, নিঝুম কারণ ছাড়াই এ ঘটনায় আমাকে জড়াচ্ছেন; কিন্তু আমি জড়িত না। বিষয়টা তাদের নিজেদের পরিবারের বিষয়। ওদের মীমাংসার জন্য বসার কথা ছিল। পরে তারা আর বসেনি।

কনস্টেবল জাকির হোসেন, মূল পরিকল্পনাকারী নয়ন ও তর বাবা মোহাম্মদ আলীর মোবাইলে ফোনকল রেকর্ড বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে- ঘটনার দিন, আগের দিন ও পরদিন মূল পরিকল্পনাকারী ভাগনে নয়ন ও তার বাবার সঙ্গে জাকিরের অসংখ্যবার মোবাইলে কথা হয়।

এমনকি ঘটনার সময়ও ঘটনাস্থলে কনস্টেবল জাকির হোসেন যে নিশ্চিতভাবে উপস্থিত ছিলেন; যা তার ফোনকল রেকর্ডে শনাক্ত হয়েছে। ফোনকলের লোকেশন বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, স্বর্ণ নিয়ে মোহাম্মদ আলী যখন কালীনগর ব্রিজের আশপাশে ছিলেন, তখন ওই এলাকাতেই ছিলেন পুলিশ জাকির।

তখনও তাদের মধ্যে কয়েকবার ফোনে কথা হয়েছে। এই কথোপকথনের ব্যাপারে জানতে চাইলে কনস্টেবল জাকির হোসেন শুধু নয়নের সঙ্গে কথা বলার বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, অনেক দিন ধরেই নয়ন তার পরিচিত। তার সঙ্গে মাঝে মাঝে কথা হয়, দেখা হয়।

তবে নয়নের বাবা মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে মোবাইলে এতবার কী কথা হয়েছে সেই প্রশ্নের জবাব দেননি তিনি। যদিও স্বর্ণ বহনের কথা মোহাম্মদ আলী স্বীকার করলেও ছিনতাই ঘটনায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। অন্যদিকে মোহাম্মদ আলীর ছেলে নয়ন দাবি করেন ঘটনার সঙ্গে তিনি জড়িত না। তার মামা নিঝুম তাদের জড়াচ্ছেন।

তদন্ত কর্মকর্তা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইয়াসির আরাফাত জানান, তদন্তে কনস্টেবল জাকিরের সম্পৃক্তা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্বর্ণের মালিক চাইলে আইনের আশ্রয় নিতে পারেন।

উল্লেখ্য, শনিবার (১১ সেপ্টেম্বর) ‘সাদা পোশাকে ছিনতাই, কোটি টাকার স্বর্ণ মেরে লম্বা ছুটিতে কনস্টেবল জাকির’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়।