হাসান পিন্টু, লালমোহন: ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই বুকসমান পানিতে নেমে পড়েন ৭৫ বছরের বৃদ্ধ আব্দুল বারেক পাটোয়ারী। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানিতে থেকে সংগ্রহ করেন শাপলা।

এরপর মাথায় শাপলার বোঝা নিয়ে ছুটে চলেন হাট-বাজার কিংবা পাড়া-মহল্লায়। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত হাঁটাহাঁটি করে শাপলা বিক্রি করে তার উপার্জন হয় মাত্র দুইশত থেকে আড়াইশত টাকা। এই সামান্য আয়েই চলে তার সাত সদস্যের সংসার।

এভাবেই প্রতিদিন বয়সের ভার আর অভাবের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন ভোলার লালমোহন উপজেলার লালমোহন ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের কর্তারকাচারি এলাকার বাসিন্দা আব্দুল বারেক পাটোয়ারী।

শাপলার মৌসুমে বিলের পানিতে নেমে শাপলা সংগ্রহ করেন তিনি। আর বছরের অন্য সময় বিল, ক্ষেত কিংবা বাগান থেকে শাকসবজি তুলে তা বিক্রি করেন।

জীবিকার তাগিদে রোদ-বৃষ্টি, কাদা-পানি; কোনো কিছুই যেন বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না তার কাছে। বৃদ্ধ আব্দুল বারেক পাটোয়ারী জানান, প্রতিদিন ফজরের নামাজ আদায় করেই শুরু হয় তার কর্মব্যস্ততা। এরপর চলে যান বিলে। বুকসমান বিলের পানিতে নেমে বহুকষ্টে শাপলা তুলে বাড়ি ফেরেন।

গোসল সেরে সেই শাপলা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন বিক্রির উদ্দেশ্যে। কোনো দিন শাপলা, কোনো দিন শাক-সবজি; যা সংগ্রহ করতে পারেন, তা বিক্রি করেই ঘুরে তার জীবিকার চাকা।

শাপলা বা শাক-সবজি বিক্রি করে দিনে দুইশত থেকে আড়াইশত টাকা উপার্জন হয় তার। কিন্তু এই সামান্য আয় থেকেও পঞ্চাশ টাকা ব্যয় হয় যাতায়াত খরচে। বাকি টাকায় তার সংসারের প্রয়োজন মেটানোই কঠিন হয়ে পড়ে।

তিনি জানান, কারণ আমার বড় সংসার। যেখানে রয়েছে- ছেলে, ছেলের বউ, নাতনিসহ মোট সাত সদস্য। এত মানুষের ভরণপোষণের দায়িত্ব অনেকটাই আমাকেই নিতে হয়।

ছেলে আয় করেও কিছু টাকা সংসার চালাতে আমাকে দেয়। তারপরও সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। এ জন্য কষ্ট হলেও শাপলা বা শাক-সবজি সংগ্রহ করে তা বিক্রি করে উপার্জন করতে হয় আমাকে। এক মুঠা শাপলার দাম ১৫ থেকে ২০ টাকা চাই। কিন্তু অনেক সময় ১০ টাকায় বিক্রি করতে হয়।

এত কষ্ট করে শাপলা সংগ্রহ করি। তবে সেই কষ্টের দাম পাই না। এই শাপলা সংগ্রহ করাও সহজ নয়। অনেক সময় বুকসমান পানিতে নেমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পরিশ্রম করতে হয়। জীবিকার তাগিদে ঝুঁকি নিয়েই প্রতিদিন পানিতে নামতে হয়।

বৃদ্ধ বারেক পাটোয়ারী আরও জানান, সরকারি চাল, বয়স্ক ভাতা কিংবা অন্য কোনো সরকারি সহায়তার কিছুই আমি পাই না। আওয়ামী লীগের সময়ও কিছু পাইনি, এখনো কিছুই পাই না।

আমরা কাজ করি, খাই। তবে মাঝে মাঝে কষ্ট হয়, এই বৃদ্ধ বয়সেও আমাকে কষ্ট করতে হয়। অনেক সময় শরীর সায় দেয় না, শরীরে নানা রোগ। তবুও পেটের টানে বের হতে হয়। তবে সরকারি সহায়তার চাল এবং বয়স্ক ভাতা পেলে অনেকটা সুবিধা হতো। এত বেশি কষ্ট তখন আর করতে হতো না।

এ বিষয়ে লালমোহন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ সিফাত বিন সাদেক বলেন, ওই ব্যক্তি আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাকে বয়স্ক ভাতা প্রদানসহ অন্যান্য সরকারি সুযোগ-সুবিধা প্রদানের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো।