ডেস্ক সংবাদ : বরিশালের বুক চিরে বয়ে যাওয়া কীর্তনখোলা নদী যেন আজও ফিসফিস করে বলে যায় পুরনো দিনের গল্প। যে গল্পের জীবন্ত দলিল প্যাডেল স্টিমার (পিএস) মাহ্সুদ। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মাহ্সুদ এখন আর আগের মতো দৌড়ে চলে না। অর্থাৎ গতি কমেছে।
তবে থামেনি ইতিহাস। সেই ইতিহাসই ধরে রাখতে শতবর্ষী ঐতিহ্যের এ নৌযানের ভেতর গড়ে তোলা হয়েছে এক অদ্ভুত জাদুঘর। একে বলা যায় নদীপথের নিঃশব্দ থিয়েটারও, যেখানে প্রতিটি জিনিস অতীতের কথা শোনায়, সঙ্গে সুরও তোলে।
স্টিমারের দরজায় পা রাখতেই মনে হয় নদীর হাওয়া গায়ে লাগে।
ভেতরের আলোটাও হাওয়ার মতো নরম। দেয়ালে টাঙানো স্টিমার মাহসুদের নির্মাণ শৈলীর ক্যাটালগ আর বয়সী নদীপথের মানচিত্র। আইজিএন আর আরএসএন কম্পানির হাতের লেখা মানচিত্রের রেখাগুলো যেন নদীর বাঁক, নিজের মতো করে আঁকা। বোঝা যায়, কতটা ভরসা ছিল তখন নদীযাত্রার প্রতি।
এর মধ্যে আইজিএন ছিল ব্রিটিশ আমলের সরকারি নৌপরিবহন বিভাগ, যারা নদীপথের সার্ভে ও রুট ম্যাপ তৈরি করতো। আর আরএসএন ছিল বাণিজ্যিক স্টিমার কম্পানি, যাত্রী ও মাল পরিবহনে আধুনিক সেবা দিত। দুই প্রতিষ্ঠানের কাজই পরে মিলিত হয়ে বিআইডাব্লিউটিসির ভিত্তি গড়ে তোলে।
জাদুঘরের একপাশে দাঁড়িয়ে টলমল আলোয় ঝকমক করছে জার্মানির ৬০ বছরের পুরনো নেভিগেশন লাইট। পাশেই স্টিমারের অভিজাত কেবিনে একসময় সাজানো থাকতো পিতলের ফুলদানি।
আলো পড়লে সোনালি ঝিলিক ওঠে। মনে হয়, যাত্রীদের হাসিমুখ এখনো লেগে আছে তাতে।
কাঁচের ফ্রেমে বন্দি বেতের হাতপাখা। ৫০ বছর আগে প্রথম শ্রেণির এক যাত্রীর হাতে ছিল। এই পাখার পাতলা বেত দিয়ে যেন বুকের ভেতর দুলে ওঠে সময়। এর পরই চোখে পড়ে ভারী এক টাইপরাইটার। ষাটের দশকের। টিকিট আর কাগজপত্র ছাপার কাজে গমগম করত যে যন্ত্র। মেশিনটি এখন নীরব, কিন্তু এর চাবিগুলোতে চাপ দিলে মনে হয়, শব্দ বেরোবে টক টক টক।
দুটি বাইনোকুলার রাখা আছে পাশাপাশি। একটি রাশিয়ার তৈরি, আরেকটি জার্মানির। বয়স আনুমানিক ৪০ থেকে ৪৫ বছর হবে। এগুলো দিয়ে নদীর বুক চষে কুয়াশা দেখতেন মাস্টার সাহেব; দেখতেন স্রোত আর ধূসর আকাশ। টেবিলের ওপর কানাডার তৈরি পুরনো ট্রান্সমিটার রিসিভার। এটিও পুরনো, পঞ্চাশের দশকের। একসময় নদীপথে যোগাযোগ বলতে এটাই ছিল প্রাণ। এখন আর কাজ করে না, তবু চেহারা দেখে মনে হয়, একটু ধরলেই ভোঁ ভোঁ শব্দ উঠবে।
জাদুঘরের এক কোণে রাখা আছে আইজিএনের পুরনো কাঠের চেয়ার। যেই কর্মকর্তা তাতে বসে থাকতেন, তার হাতে হয়তো থাকতো কাগজ-কলম, চোখে নদীর দিকে তাকানোর অদ্ভুত নিশ্চিন্ত ভাব। ঘড়ির দিক ঘুরলেই দেখা যায় ১৯৬৪ সালে তৈরি স্টিমারের ঘণ্টা। ধাতব শরীরে আজও টঙ্কারের (ঘণ্টা বাজার সময় টং করে ওঠা শব্দ) স্মৃতি লেগে আছে। আর আছে প্রায় শত বছরের পুরনো ঢালিরেঞ্জ। প্যাডেল মেরামতে ব্যবহার হতো। ভারী এই ধাতুকে ছুঁলে বোঝা যায়, কত শক্তি দিয়ে নদীপথের জীবন চলতো।
নরওয়েতে তৈরি ১৯৭২ সালের কম্পাস রাখা কাঠের স্ট্যান্ডে। তার সূচ নিস্তব্ধ, কিন্তু মনে হয় নদীর বাতাস ধরতে চায় এখনও। চীনের ৫৫ সাংহাই ক্লক কম্পানির তৈরি পুরনো ঘড়ি। সেই ঘড়ি আবারও মনে করিয়ে দেয় স্টিমারের লাউঞ্জে কেটে যাওয়া বিকেল। ১৯৪৮ সালের কম্পাসটাও পাশেই। যেন নৌ ইতিহাসের দুই প্রজন্ম একসঙ্গে দাঁড়িয়ে।
আরো আছে পঞ্চাশ বছরের পুরনো টেলিফোন সেট, পুরনো প্রোপেলার, ৬০ বছরের ইঞ্জিন টেলিগ্রাফ। যেন শব্দহীন কোনো অপেরা, যেখানে প্রতিটি যন্ত্রই এক এক সময়ের সঙ্গীত। ৮০ বছরের পুরনো ডিসি ফ্যান। ব্লেডগুলো ঘোরে না, তবু মনে হয় একটু ছোঁয়া দিলেই গরম হাওয়া কাটিয়ে শীতলতা ছড়াবে। ফগহর্ন, কাঠের হুইল, হ্যান্ড মাইক, পানির ফিল্টার, পুরনো রেডিও- প্রতিটি জিনিসই নদীর স্মৃতি ধরে রেখেছে। আর রয়েছে ৭০ বছরের পুরনো তালা। ছোট্ট, কিন্তু বোঝা যায় একটি পুরো যুগ পাহারা দিয়েছে সে।
১৯৩৪ সালে আইজিএন ও আরএসএন কম্পানি কলকাতা থেকে সুন্দরবন হয়ে গোয়ালন্দ পর্যন্ত স্টিমার ভ্রমণের বিশেষ আয়োজন করে। যাত্রা শেষে ট্রেনে ফেরার ব্যবস্থা ছিল। বিজ্ঞপ্তিতে আগাম টিকিট সংগ্রহের অনুরোধ জানানো হয় এবং যাত্রীদের কেবিন, খাবার ও নিরাপদ যাত্রার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। সেই বিজ্ঞপ্তির কপিও জাদুঘরে স্থান পেয়েছে।
৬৬ বছর পর আবার স্টিমারে ঢাকায় যাচ্ছিলেন নার্গিস রফিকা রহমান। তিনি বলেন, এই জাদুঘর স্টিমারের ভেতরে তৈরি হলেও, এর ভেতরে হাঁটলে মনে হয় কোনো নদীকথার বইয়ের পাতায় ঢুকে গেছেন, যেখানটা শব্দহীন অথচ জীবন্ত। পিএস মাহ্সুদের কাঠের শরীরের ভেতর জেগে আছে এক পুরো ধরনের দেশ। নদীর যে ইতিহাস আমরা ভুলে গেছি, সেই ইতিহাসই এখানে ধুলো থেকে উঠে এসে চোখে আঙ্গুল রেখে বলে, ‘আমাদের মনে আছে?
স্টিমার ইতিহাসের নিঃশব্দ সাক্ষী
ইতিহাস ঘেটে কবি হেনরী স্বপন বলেন, ১৮৮৯ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিলাইদহ, শাহজাদপুর এবং পতিসরের জমিদারি দেখভালের দায়িত্ব নেন। সেই সময় নদীপথই ছিল সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ ব্যবস্থা। কবির যাতায়াত, জমিদারি তদারকি, নদীতীরের মানুষের সঙ্গে ওঠাবসা- সবই হতো এই স্টিমারে চড়ে। গঙ্গা-পদ্মা-গড়ইয়ের স্রোতে স্টিমারের জানালা দিয়ে দেখা বাংলার রূপ বহুবার উঠে এসেছে তাঁর চিঠিপত্র ও কবিতায়।
এর কয়েক দশক পর, ১৯২৯ থেকে ১৯৩৫ সালের মধ্যে জীবনানন্দ দাশ প্রায় নিয়মিত বরিশাল-খুলনা রুটে স্টিমারে ভ্রমণ করতেন। নদীর ধারে জেগে থাকা একলা জনপদ, চর, জঙ্গল, খেয়াঘাট- এসব তাঁর কাব্যভাষায় গভীর ছাপ ফেলেছিল। ‘রূপসী বাংলা’-র পাতায় সেই নদীপথ ভ্রমণের প্রতিধ্বনি আজও টের পাওয়া যায়।
হেনরী স্বপন আরো বলেন, রাজনীতিতেও স্টিমার ছিল চলমান মিলনমঞ্চ। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বহুবার প্যাডেল স্টিমারে ভ্রমণ করেছেন।
১৯৭৪ সালের ২৯ জানুয়ারি রাষ্ট্রীয় সফরে ঢাকায় আসেন যুগোস্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট মার্শাল টিটো। সব প্রটোকল ও আড়ম্বরের বাইরে তিনি নদী দেখার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর জন্য বিশেষভাবে সাজানো হয়েছিল একটি প্যাডেল স্টিমার। সেদিন পদ্মা-যমুনার পানির ওপর ভেসে দেখে গিয়েছিলেন নবীন দেশের নদীমাতৃক রূপ। সেই বিষয়গুলো স্থান পেয়েছে জাদুঘরে।