নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল: এক হাজার শয্যার বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন চিকিৎসা নিচ্ছেন গড়ে পাঁচ হাজার রোগী। এর মধ্যে আড়াই থেকে তিন হাজার প্রতিদিন ভর্তিই থাকেন। আর বহির্বিভাগে প্রতিদিন আরও দুই হাজারের বেশি রোগী চিকিৎসা দেন।
এ অবস্থায় শয্যা সংকটে ওয়ার্ডের বাইরে করিডর, বারান্দা ও খোলা জায়গায় বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে হয়। এর মধ্যে দেখা দিয়েছে রোগীদের খাবার সরবরাহের সংকট। গত চার মাস ধরে সরকারি বরাদ্দের অর্থ না আসায় রোগীদের খাবারে টান পড়েছে।
চার মাসেও আসেনি সরকারি বরাদ্দ
হাসপাতালের প্রশাসনিক দফতর সূত্র জানায়, সরকারিভাবে চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত (৫ নভেম্বর) বরাদ্দ না পাওয়ায় খাবার সরবরাহের এই সংকট তৈরি হয়েছে। যেখানে দিনে কোটি টাকার বেশি রোগীদের পেছনে খরচ লাগে, সেখানে গত জুলাই মাস থেকে কোনও অর্থই সরকারিভাবে বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। অথচ গত জুলাই মাস থেকে সরকারি বরাদ্দের অর্থ ছাড় দেওয়ার কথা ছিল। যা এখনও দেওয়া হয়নি।
এ অবস্থায় রোগীদের খাবারের জোগান দেওয়া চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে হাসপাতালের পরিচালকের অনুরোধে নিজেদের উদ্যোগে এখনও খাবার সরবরাহ দিয়ে যাচ্ছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে গত ১৫ অক্টোবর থেকে রোগীদের খাবারের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে ডিম। তবে এখন পর্যন্ত খাবার সরবরাহ চালু রাখা হয়েছে। যদি আগামী অর্থবছরের আগে সরকারি বরাদ্দ না পাওয়া যায় তাহলে আগামী মার্চ থেকে খাবার সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন হাসপাতালের পরিচালক।
চিকিৎসাসেবা নিয়েও রয়েছে নানা সংকট
শুধু খাবার নয়, হাসপাতালটিতে চিকিৎসাসেবা নিয়েও রয়েছে নানা সংকট। এক্স-রে ফিল্ম ও থাইরয়েড পরীক্ষার ওষুধ নেই। প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাবে সিটি স্ক্যানসহ বিভিন্ন পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে। ক্যানসারসহ জটিল রোগের ওষুধের সংকট দীর্ঘদিনের। অপরদিকে হাসপাতালের দুটি ভবনের ১৩টি লিফটের মধ্যে আটটি অচল থাকায় পাঁচতলা ভবনে দুটিতে রোগীদের ওঠানামায় ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে স্বজনদের।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বরিশাল বিভাগের ছয় জেলার মানুষের প্রধান ভরসাস্থল হলেও বর্তমানে আশপাশের আরও কয়েকটি জেলার রোগী এখানে চিকিৎসা নিতে আসছেন। ফলে এক হাজার শয্যার হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে তিন হাজার রোগীকে ভর্তি রেখে চিকিৎসাসেবা দিতে হচ্ছে। এ ছাড়া বহির্বিভাগেও দিনে চিকিৎসা নিচ্ছেন দুই হাজারের বেশি মানুষ। সবমিলিয়ে পাঁচ হাজার রোগী চিকিৎসা নেন।
রোগীর চাপ সামলাতে হাসপাতালের প্রতিটি তলা, বারান্দা ও খালি জায়গায় বিছানা পেতে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। মেঝের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পরিচালক খোলা জায়গায় ৯৭৮টি বেডের ব্যবস্থা করেছেন। এর বাইরেও এক হাজারের বেশি রোগী মেঝেতে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। নিয়মিত ওয়ার্ডের নির্ধারিত শয্যায় রয়েছেন আরও এক হাজার রোগী। এমনকি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) ওয়ার্ডেও মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে মুমূর্ষু রোগীদের।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, পদ্মা সেতুর এপারে তিনটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে হাসপাতাল থাকলেও দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে রোগীরা শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আসছেন।
তাদের বড় অংশই গ্রাম থেকে আসেন। একজন রোগীর সঙ্গে দুই থেকে তিনজন স্বজন আসায় প্রতিদিন হাসপাতালে গড়ে ১০ হাজার মানুষের উপস্থিতি থাকে। এতে চিকিৎসার পরিবেশ ও স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। হাসপাতালের ভেতরে হাঁটাচলার জায়গাও অনেক ক্ষেত্রে রোগীদের দখলে থাকছে। এত বিপুলসংখ্যক রোগী ও তাদের স্বজনদের খাবার সরবরাহ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে।
কিন্তু চলতি বছর অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় ঠিকাদারের মাধ্যমে আপাতত খাবার সরবরাহ চালু রাখা হয়েছে। তবে গত ১৫ অক্টোবর থেকে খাবারের তালিকায় কাটছাঁট করে রোগীদের ডিম দেওয়া বন্ধ করা হয়েছে।
পরিচালক বললেন বরাদ্দ না আসায় এই অবস্থা
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. এ কে এম মশিউল মুনীর বলেন, ‘গত জুলাই মাস থেকে সরকারি বরাদ্দ না আসায় ঠিকাদারকে দিয়ে আপাতত কোনোমতে খাবার সরবরাহ চালিয়ে যেতে বলা হয়েছে। এ কারণে রোগীপ্রতি ১৫ টাকা খরচ কমানো হয়েছে। ডিম ছাড়া খাবারের তালিকা থেকে আর কিছু বাদ দেওয়ার সুযোগ ছিল না। বরাদ্দ এলে আবার ডিম খাবারে যুক্ত করা হবে। আর যদি সরকারি বরাদ্দ না আসে আগামী বছরের মার্চ থেকে খাবার সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।’
অর্ধেকে নেমেছে হাসপাতালের আয়
হাসপাতালের আয় কমে যাওয়ার বিষয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন পরিচালক। তিনি বলেন, ‘যোগদানের পর থেকে হাসপাতালের কারও সহযোগিতা পাচ্ছি না। বিশেষ করে হাসপাতালে যেসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা সম্ভব, সেগুলোও বাইরে থেকে করানো হচ্ছে। প্রতিদিন ১ হাজার ১০০ রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা হওয়ার কথা থাকলেও হচ্ছে মাত্র ৫০০ জনের। অথচ আমাদের লক্ষ্য প্রতিদিন দুই হাজার রোগীর পরীক্ষা করা। কর্মচারীদের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে হাসপাতালের আয় কমেছে। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় আয় অর্ধেকে নেমেছে।’
পরিচালক আরও বলেন, ‘দায়িত্ব নেওয়ার পর হাসপাতালের শৃঙ্খলা ফেরাতে একাধিক ওয়ার্ড স্থাপনসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছি। আগে ওয়ার্ডের বাইরে মেঝেতে যারা চিকিৎসা নিতেন, তাদের জন্যও বেডের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু সবার সহযোগিতা না পাওয়ায় পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না।’ আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘এখন আমার এখানে থাকতে ইচ্ছে করে না। আপনারা খবর প্রকাশ করে আমাকে এখান থেকে সরিয়ে দেন।’
ওষুধের অভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ
হাসপাতালের প্রশাসনিক দফতর সূত্র জানায়, এক্স-রে ফিল্ম থেকে শুরু করে থাইরয়েড পরীক্ষার ওষুধের সংকট রয়েছে। সিটি স্ক্যান মেশিন সচল থাকলেও প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ আছে। ক্যানসারসহ জটিল রোগের ওষুধও দীর্ঘদিন ধরে পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি জটিল অস্ত্রোপচার করাও সম্ভব হচ্ছে না। এক হাজার রোগীর জন্য যে বরাদ্দ প্রয়োজন, সেখানে পাঁচ হাজার রোগীকে সেবা দিতে হচ্ছে। মাসে সরকারের দেওয়া বরাদ্দ দিয়ে ১১ দিনের বেশি চলা সম্ভব হয় না বলে জানিয়েছে প্রশাসনিক দফতর।
১৩টি লিফটের মধ্যে আটটি অচল থাকায় পাঁচতলা ভবনে দুটিতে রোগীদের ওঠানামায় ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে স্বজনদের
১৩টি লিফটের মধ্যে আটটি অচল থাকায় পাঁচতলা ভবনে দুটিতে রোগীদের ওঠানামায় ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে স্বজনদের
১৩টি লিফটের আটটি অচল
হাসপাতালের পুরোনো পাঁচতলা ও নতুন পাঁচতলা ভবনে মোট ১৩টি লিফট রয়েছে। এর মধ্যে পুরোনো ভবনের নয়টি লিফটের পাঁচটি এবং নতুন ভবনের চারটির মধ্যে তিনটি অচল। ফলে রোগীদের এক তলা থেকে অন্য তলায় নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। গুরুতর অসুস্থ রোগীকে ট্রলিতে করে নিতে লিফটের সামনে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। পরে সিরিয়াল ধরে লিফটে ওঠানামা করতে গিয়ে ভোগান্তি আরও বাড়ছে।
গণপূর্ত বিভাগের গাফিলতিতে অচল লিফট
লিফট সচল না হওয়ার বিষয়ে পরিচালক বলেন, ‘এ সমস্যা সমাধানে বারবার গণপূর্ত বিভাগকে জানানো হলেও তাদের গাফিলতির কারণে কাজ হচ্ছে না। এতে রোগীদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে গণপূর্ত বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. রাশেদুজ্জামান বলেন, ‘লিফট সচল করার জন্য বিল তৈরি করে অনেক আগেই সংশ্লিষ্ট দফতরে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে বরাদ্দ অনুমোদন হলে দরপত্রের মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হবে। এরপর কাজ শুরু হবে।’