নিজস্ব প্রতিবেদক : মধ্য অগ্রহায়ন থেকে বরিশালের মাঠে মাঠে শুরু হওয়া ফসল কাটার ধুম চলছে। চলবে পৌষের শেষ পর্যন্ত। সব প্রাকৃতিক দুর্যোগ অতিক্রম করে এবার সর্বকালের সর্বোচ্চ ২৫ লক্ষাধিক টন আমন চাল ঘরে তোলার লক্ষ্য অর্জনে আশায় বুক বেঁধে আছেন বরিশাল কৃষি অঞ্চলের কৃষিযোদ্ধাগণ। তবে প্রায় ১৪ লাখ টন খাদ্য উদ্বৃত্ত বরিশালের মাঠে সকাল-সন্ধ্যা কৃষিযোদ্ধাদের ব্যস্ততা আর অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল ঘরে উঠতে শুরু করলেও ধানের দর কৃষকদের সন্তুষ্ট করতে পারছে না। ইতোমধ্যে প্রায় ৬৭ ভাগ ধান কৃষকের গোলায় উঠলেও হাজার টাকারও বেশি উৎপাদন ব্যয়ের আমন ধান বিক্রি হচ্ছে ১১শ থেকে সাড়ে ১১শ টাকার মধ্যে। অথচ কৃষি মজুর, কীটনাশক ও সার থেকে শুরু করে এবার সব কিছুরই দাম বেড়েছে, বাড়েনি শুধু ধানের দাম। শীতের সকালে সোনালী সূর্যোদয় থেকে কৃষিযোদ্ধাগণ মাঠে নেমে পড়ছেন অনেক পরিশ্রমের ফসল ঘরে তুলতে।
সমাপ্তপ্রায় খরিপ-২ মৌসুমে বরিশাল কৃষি অঞ্চলে ৮ লাখ ৮৫ হাজার ৩৪ হেক্টরে লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে ৯ লাখ হেক্টরেরও বেশি জমিতে আমন আবাদ সম্পন্ন করেছিলেন কৃষিযোদ্ধাগণ। ফলে প্রায় ২৪ লাখ টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্য অতিক্রম করে ২৫ লাখ টনে পৌঁছাতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে কর্তনকৃত জমিতে গড় ফলন ৩.০৫ টনে পৌঁছায় উৎপাদনে লক্ষ্য অতিক্রমের সুস্পষ্ট আভাস মিলেছে বলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে।
তবে এখনো বরিশাল কৃষি অঞ্চলে হাইব্রিডসহ উচ্চ ফলনশীল (উফশী) জাতের আমন ধানের আবাদ কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের থেকে অনেকটাই পেছনে। এখনো বরিশাল অঞ্চলে স্থানীয় সনাতন জাতের ধানের আবাদ প্রায় ৩৫ ভাগের কাছাকাছি। হাইব্রিড ধানের আবাদ আমনে ১ ভাগেরও কম। উচ্চ ফলনশীল-উফশী জাতের ধানের আবাদ ৬৫ ভাগের মতো। অথচ স্থানীয় সনাতন জাতের ধানের উৎপাদন হেক্টরপ্রতি ১.৬৮ টন, উফশী ২.৮৯ টন এবং হাইব্রিড জাতের ধানের উৎপাদন স্থানীয় জাতের প্রায় আড়াই গুণ—৩.৯০ টন প্রতি হেক্টরে। তবে বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলে ইতোমধ্যে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত তিনটি জাতের ধানের আবাদ ক্রমে বাড়ছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটির বরিশাল আঞ্চলিক কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা।
কৃষকদের দাবি, ‘উচ্চ ফলনশীল জাতের ধানের বীজের পাশাপাশি উৎপাদন প্রযুক্তি জ্ঞানের অভাবে তাদের পক্ষে কম জমিতে বেশি ধান উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। অথচ আবাদকৃত আমনের অন্তত ৮০ ভাগে উফশী এবং ২০ ভাগ হাইব্রিড ধানের আবাদ সম্ভব হলেও বরিশাল অঞ্চলে আমনের উৎপাদন অন্তত ৩০ লাখ টনে উন্নীত করা সম্ভব,’ বলে মনে করছেন মাঠ পর্যায়ের কৃষিবিদগণ। এতে করে বরিশালে উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্যের পরিমাণ বর্তমানের ১৪ লাখ টন থেকে ২০ লাখ টনে উন্নীত করা সম্ভব বলে মনে করছেন কৃষিবিদগণ।
বিষয়টি নিয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বরিশাল অঞ্চলের প্রধান নির্বাহী ও অতিরিক্ত পরিচালক ড. মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম শিকদারের সঙ্গে আলাপ করা হলে তিনি বিষয়টির সঙ্গে সহমত পোষণ করে বলেন, আমরা পর্যায়ক্রমে দক্ষিণাঞ্চলে হাইব্রিডসহ উচ্চ ফলনশীল জাতের আমন আবাদ বৃদ্ধির সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছি। আগামী মৌসুমগুলোতে দক্ষিণাঞ্চলে আমন আবাদে আরও বৈচিত্র আনার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে আমনের আশাতীত সাফল্যের পর আসন্ন রবি মৌসুমে বরিশাল অঞ্চলের ৩.৮৩ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদে লক্ষ্যে বীজতলা তৈরির কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। বিগত রবি মৌসুমে এ অঞ্চলের কৃষিযোদ্ধাগণ প্রায় সাড়ে ৩ লাখ হেক্টর জমিতে সাড়ে ১২ লাখ টন বোরো চাল ঘরে তুলেছিলেন।
তবে বরিশালের মাঠে মাঠে এখন পুরোদমে প্রধান দানাদার খাদ্যশস্য আমন কাটায় ব্যস্ত কৃষিযোদ্ধাগণ। সকাল থেকে দুপুর গড়িয়ে বিকেল পর্যন্ত মাঠে মাঠে আমন ধান কাটার পর পড়ন্ত বিকেলে ধানের বোঝা মাথায় নিয়ে ঘরে ফেরার চিরায়ত দৃশ্য এখন সবারই চোখ জুড়াচ্ছে।
তবে ধানের দরপতনে কৃষকের মুখে হাসি নেই এবারও। কিন্তু এ নিয়ে কারও তেমন কোনো মাথাব্যথা নেই। সব মিলিয়ে ‘যারা যোগায় ক্ষুধার অন্ন, আমরা আছি তাদের জন্য’—কথাটি অনাদিকালের হলেও তার সত্যতা এখন খুঁজে পাওয়া ভার, বলেই মনে করছেন বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিযোদ্ধাগণ।