নিজস্ব প্রতিবেদক : আজ এ ঘাটে, কাল ও ঘাটে জোয়ার-ভাটার ছন্দে চলে জীবন। জন্মের পর থেকেই নৌকায় বেড়ে ওঠা। নৌকাতেই হয় বিয়ে এবং সংসার। মৃত্যুও হয় নৌকায়। যুগ যুগ ধরে মুসলিম এই মান্তা সম্প্রদায়ের ভাসমান জেলে পরিবারের লোকেরা নৌকায় বসবাস ও নদীতে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। সম্বল বলতে একটি কাঠের নৌকা ছাড়া আর কিছুই নেই। অজানা এক যাযাবর জীবন তাদের, ঝড়-বৃষ্টি-রোদে, শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষায় ১২ মাসই তাদের ঠিকানা এই নদীর জলে নৌকা ভাসমান থেকে। নির্দিষ্ট কোনো গ্রাম নেই, কোনো ঘরবাড়ি নেই, নেই ভেসে যাওয়ার সীমানা। দিন-রাত সবই যেন সমানভাবে কেটে যায় নৌকায় ভেসে ভেসে।
বরিশালের বাকেরগঞ্জ রাঙ্গামাটি নদীতে এমন ১০টি জেলে পরিবারের দেখা মিলেছে। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলা ও লাহারহাট এলাকায় তাদের পূর্ব পুরুষদের বাড়িঘর থাকলেও এখন তাদের নিজস্ব কোনো ঘরবাড়ি জায়গা জমি নেই। জেলার বিভিন্ন উপজেলার নদ-নদীতে জেলে পরিবারগুলো বসবাস করায় অনেকের ভোটার আইডি কার্ড হয়নি। শিক্ষা, চিকিৎসাসহ মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত এসব মানুষ। সমাজ-সভ্যতা থেকে ছিটকে পড়া এই জনগোষ্ঠীর ভাগ্যের উন্নয়ন হয়নি কয়েক যুগেও।
নদীর জলে স্রোতের তালে ভেসে-ভেসে জাল দিয়ে মাছ ধরে চলে তাদের জীবন জীবিকা। যেদিন মাছ ধরতে পারে সেদিন উনুনে আগুন জলে। টানা কয়েকদিন মাছ না পেলে থাকতে হয় অনাহারে অর্ধহারে। এসব পরিবারগুলো ছোট্ট শিশু স্ত্রী নিয়েই যেন নৌকার ছইয়ের মধ্যে ছোট্ট সংসার। শিশুদের আগামী জীবন অনিশ্চিত, নৌকায় থাকার কারণে তাদের হচ্ছে না লেখাপড়া। এমন জীবন থেকে মুক্তি চেয়ে সরকারি সহায়তা চেয়েছেন তারা।
বাকেরগঞ্জের রাঙ্গামাটি নদীতে নৌকায় বসে কথা হয় জেলে অহিদা বেগমের সঙ্গে। তিনি এক বছরের মেয়েকে কোলে নিয়ে বলেন, স্বামী-স্ত্রী দুইজনেই মাছ ধরি, কিন্তু অনেকদিন মাছ পাই না। কেউ মরে গেলে কবর দেওয়ার মতো জায়গাও নাই আমাদের। তার কথায় ফুটে ওঠে ভাসমান ছেলেদের দীর্ঘ দুঃখগাথা। গরমে দম বন্ধ অবস্থা, বৃষ্টিতে পানি ঢোকে, শীতে হাড় কাঁপানো ঠা-া- প্রতিটি ঋতুই তাদের জন্য নতুন দুর্ভোগ। তবু ঘর না থাকায় নৌকাই তাদের স্থায়ী আশ্রয়।
জেলে মোহন সরদার বলেন, নদী আবার মা, আবার শত্রু। মাছ দেয়, আবার ঘরও নিয়ে যায়। তবুও নৌকা ছাড়া আর কিছু নাই। নৌকায় থেকে শিশুদের পড়াশোনা প্রায় অসম্ভব। আমরা আজ এক নদীতে কাল আরেক নদীতে বসবাস করি। যে কারণে ছেলেমেয়েদের স্কুলে ভর্তি করানো সম্ভব হয় না। আমরা কেউ অসুস্থ হলে চিকিৎসা সেবাও পাই না। বৃদ্ধ জেলে বারেক হোসেন জানান, ‘নদীতেই বাচ্চারা জন্ম নেয়, নদীতেই বড় হয়।
সারা বছরই সংগ্রাম, বর্ষায় কষ্টটা আরও বাড়ে। কত সরকার গেল আর আসলো আমাদের খবর কেউ নিল না। বৃষ্টিতে ভিজি আর রোদে শুকাই এই আমাদের জীবন। সরকার কত মানুষরে ঘর দিছে, আমি একটা ঘরের জন্য কত দৌড়াইছি। কিন্তু সরকারি ঘর আমার কপালে জোটেনি।
এই মান্তা সম্প্রদায়ের ভাসমান জেলেদের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা যায়, লাহারহাট এলাকায় মান্তা সম্প্রদায়ের প্রায় ১০০টি পরিবার বাস করে। ঝড়-জলোচ্ছ্বাস, দুর্যোগ-দুর্বিপাকের মধ্যে নদীর কোঠরেই তাদের জন্ম-মৃত্যু। শুকনো মৌসুমে তারা জেলার বিভিন্ন উপজেলায় নদীতে মাছ শিকার করতে বের হয়। মাঝে মধ্যে তাদের স্থানীয় জেলেদের রোষানলে পড়তে হয় মাছ শিকার করতে এসে। প্রজন্ম ধরে তারা অধিকারবঞ্চিত। বাসস্থান, শিক্ষা, খাদ্য সবই সংকটে।
রাঙ্গামাটি নদীতে ভাসমান জেলে পরিবারদের আর্তনাদ প্রশাসনের কাছে স্থায়ী সমাধানের। দাবি তুলছে তারা শুধু সহানুভূতি নয়, চায় নিশ্চিত জীবনমান, নিরাপদ আশ্রয় ও মৌলিক অধিকার। বরিশাল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ও সহকারী পরিচালক সমীর কুমার বসাক বলেন, কার্ডবঞ্চিত প্রকৃত জেলেদের তালিকা করা হচ্ছে। জেলে কার্ড পেলে তারা সরকারি সহায়তা, ভিজিডি চাল, প্রশিক্ষণ ও উপকরণ পাবেন। ইতোমধ্যে তাদের মাঝে সরকারিভাবে মাছ ধরার জাল বিতরণ করা হয়েছে। তাদের বাসস্থানের বিষয়টি দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
বরিশার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খায়রুল আলম সুমন জানান, ভাসমান ও নৌকায় বসবাসকারী জেলেদের পুনর্বাসন ও নিরাপত্তা কর্মসূচিতে আনার কাজ চলছে। শিশুদের শিক্ষার জন্যও বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাদের জীবনমান উন্নয়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।