অনলাইন ডেস্ক : জাতীয় সংসদকে ‘কোটিপতিদের ক্লাব’ থেকে বের করে আনার দাবি দেশের রাজনীতিতে নতুন নয়। তবে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দীর্ঘদিন ধরে প্রান্তিক অবস্থানে থাকা বাম দলগুলো সেই প্রশ্ন আবারও সামনে আনছে।
বরিশাল-৫ (সিটি করপোরেশন, সদর উপজেলা) আসনে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) মনোনীত প্রার্থী ডা. মনীষা চক্রবর্তীর প্রার্থিতা সেই আলোচনাকেই নতুন করে উসকে দিচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিযোগ, স্বাধীনতার পর দেশের রাজনীতি দুর্নীতি, ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন ও লুটপাটের বৃত্তে আবদ্ধ ছিল।
সংসদে জনপ্রতিনিধিদের বড় অংশই ছিলেন কোটিপতি কিংবা প্রভাবশালী ব্যবসায়ী। ফলে সাধারণ মানুষের সমস্যা কতটা প্রতিফলিত হয় সংসদে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এই বাস্তবতায় বিকল্প রাজনীতির সুযোগ আদৌ আছে কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই বাসদের এই প্রার্থিতা।
বরিশালে ডা. মনীষা চক্রবর্তীর পরিচয় কেবল একজন রাজনীতিক হিসেবে নয়।
তিনি দীর্ঘদিন ধরে ‘গরিবের ডাক্তার’ হিসেবেও পরিচিত। বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজে পড়াশোনার সময় থেকেই তিনি ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত হন। প্রশ্নফাঁসবিরোধী আন্দোলন, সুন্দরবন রক্ষা, তনু হত্যার বিচার, বস্তি উচ্ছেদ ও ব্যাটারিচালিত রিকশাশ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে তাঁকে নিয়মিত রাজপথে দেখা গেছে।
মনীষার পারিবারিক ইতিহাসও রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় তাঁর পিতামহ আইনজীবী সুধীর কুমার চক্রবর্তী রাজাকারদের হাতে নিহত হন। বাবা অ্যাড. তপন কুমার চক্রবর্তী ছিলেন মুক্তিযুদ্ধে ৯ নম্বর সেক্টরের সংগঠক।
রাজনৈতিক সহকর্মীদের ভাষ্য, পারিবারিক এই উত্তরাধিকার থেকেই মনীষা শোষণবিরোধী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন।
চিকিৎসা পেশায় থেকেও মনীষার পথচলা ব্যতিক্রম। শেবাচিম থেকে এমবিবিএস পাস করার পর ৩৪তম বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত হলেও তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দেননি।
বাসদ নেতাদের দাবি, ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের চেয়ে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়কেই তিনি অগ্রাধিকার দিয়েছেন। ২০১৮ সালে ব্যাটারিচালিত রিকশাশ্রমিকদের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। একই বছর বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তুলে নির্বাচন বর্জন করেন তিনি। সে সময় সিল মারা ব্যালট হাতে নেওয়ার ঘটনায় হামলারও শিকার হন তিনি।
বরিশালের প্রবীণ শিক্ষাবিদ অধ্যাপক শাহ শাজেদা বলেন, করোনা মহামারির সময় ফ্রি অক্সিজেন ও অ্যাম্বুল্যান্স সেবা, ত্রাণ বিতরণসহ নানা উদ্যোগ মনীষাকে শ্রমজীবী মানুষের কাছে আরো পরিচিত করে তোলে। ‘মানবতার বাজার’-এর মাধ্যমে প্রায় ২০ হাজার মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে করোনা রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার ঘটনাগুলো তখন দেশজুড়ে আলোচনায় আসে। সবকিছুর উর্ধ্বে তিনি একজন মানবিক নারী। কোরবানির সময় বাড়ি বাড়ি ঘুরে মাংস সংগ্রহ করে তা রান্না করে খেটে খাওয়া মানুষদের মাঝে বিতরণ করেন।
মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা খানম নাসরিন বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান অপসোনিনে শ্রমিক আন্দোলনে মনীষার সক্রিয়তা ছিল স্পষ্ট। ওই আন্দোলনে তিনি নিজেও যুক্ত ছিলেন। এ ছাড়া বিভিন্ন কারখানায় মজুরি বাড়ানোর দাবি, ভোলার গ্যাস ব্যবহার করে বরিশাল অঞ্চলে শিল্পায়নের দাবি, নারী নির্যাতন ও পরিবেশ রক্ষার ইস্যুতেও মনীষাকে মাঠে সক্রিয় থাকতে দেখা গেছে।
মনীষা চক্রবর্তী বলেন, সাম্প্রতিক কয়েকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যাঁরা নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁদের অনেকেই পরে দুর্নীতিবাজ ও ঋণখেলাপিদের প্রভাবাধীন হয়ে পড়েছেন। তিনি বলেন, ‘আপনারা যদি সৎ ও যোগ্য মানুষকে সংসদে দেখতে চান, তাহলে দুর্নীতিবাজদের না বলতে হবে। যারা সত্যিই দেশের কথা ভাবেন, তাঁদের পাশে দাঁড়াতে হলে কোটিপতিদের ক্লাবের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে।
মনীষা জানান, তাঁদের কর্মীদের মধ্যে ‘মাটির ব্যাংক’ চালু করা হয়েছে। সেখানে খেটে খাওয়া মানুষ ক্ষুদ্র অনুদানের মাধ্যমে তাঁদের নির্বাচনী কার্যক্রমে সহায়তা করছেন। তিনি বলেন, ‘আপনারাও চাইলে আমাদের এই উদ্যোগে পাশে দাঁড়াতে পারেন।’