অনলাইন ডেস্ক : ভোটের অঙ্কে দেশের মানচিত্র এখনো সমান নয়। রাজধানী ঢাকা কিংবা গাজীপুরের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় যেখানে ভোটারের ঘনত্ব চোখে পড়ে, তার উল্টো চিত্র দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি সংসদীয় আসনে।
নির্বাচন কমিশনের সবশেষ ভোটার তালিকা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভোটার সংখ্যার দিক থেকে দেশের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা আসনগুলোর একটি ঝালকাঠি-১।
রাজাপুর ও কাঁঠালিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে মোট ভোটার দুই লাখ ২৮ হাজার ৪৩৬ জন।
এর মধ্যে পুরুষ ভোটার এক লাখ ১৬ হাজার ৪২৭ জন, নারী এক লাখ ১২ হাজার সাতজন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন দুজন। জাতীয় গড়ের তুলনায় এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কম। একই তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে পিরোজপুর-৩ আসন। সেখানে মোট ভোটার দুই লাখ ৪১ হাজার ৩৬০ জন।
এর মধ্যে পুরুষ এক লাখ ২২ হাজার ৪৪ জন, নারী এক লাখ ১৯ হাজার ৩১৫ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার একজন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বরিশালের সম্পাদক ও নির্বাচন বিশ্লেষক রফিকুল আলম বলেন, ‘এই পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে দক্ষিণাঞ্চলের একাধিক আসনে ভোটার সংখ্যা রাজধানীর একেকটি ওয়ার্ডের চেয়েও কম। জনসংখ্যা কম হওয়ায় সরকারি বরাদ্দও তুলনামূলক কম আসে। ফলে এসব এলাকা উন্নয়নের দিক থেকে পিছিয়ে পড়ছে।
দীর্ঘদিন ধরেই এখানে অভিবাসন, কর্মসংস্থান সংকট এবং নগরমুখী মানুষের চাপ রয়েছে।
কোথাও ভোটার কম, কোথাও প্রার্থী ভোটার সংখ্যার এই অসমতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রার্থী সংখ্যার ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে অদ্ভুত বৈষম্য। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিবন্ধিত ৬০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫১টি দল প্রার্থী দিয়েছে। শুরুতে আড়াই হাজারের বেশি প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিলেও যাচাই-বাছাই, আপিল ও আদালতের রায়ের পর প্রতীক বরাদ্দ পেয়েছেন এক হাজার ৯৮১ জন।
তবে ৯টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল এবার কোনো আসনেই প্রার্থী দেয়নি।
দলগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ সাম্যবাদী দল (এমএল), কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টির একটি অংশ, জাসদের একাংশ, বিকল্পধারা বাংলাদেশ, তরিকত ফেডারেশন, তৃণমূল বিএনপি ও বিএনএম। জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে একটি জোট গঠিত হলেও শেষ পর্যন্ত নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান তাঁরা।
প্রার্থী সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ভিড় ঢাকা-১২ আসনে। তেজগাঁও ও ফার্মগেট এলাকা নিয়ে গঠিত এই আসনে লড়ছেন ১৫ জন। বিপরীতে সবচেয়ে কম প্রার্থী পিরোজপুর-১ আসনে, মাত্র দুজন।
পিরোজপুর-১ আসনে প্রায় একক লড়াই
পিরোজপুর-১ আসনে দুই প্রার্থীর একজন বিএনপির অধ্যক্ষ আলমগীর হোসেন, অন্যজন জামায়াতে ইসলামীর মাসুদ সাঈদী। যাচাই-বাছাইয়ে দুইজনের প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করেন পিরোজপুর রিটানিং কর্মকর্তা। কিন্তু জামায়াতের প্রার্থী তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থীর মনোনয়ন প্রক্রিয়া অবৈধ দাবি করে আপিল করেন। আপিলে মনোনয়নপত্রের বৈধতা পান বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ও দলটির নির্বাহী কমিটির সদস্য আলমগীর হোসেন।
১৫ জানুয়ারি রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে অনুষ্ঠিত আপিল শুনানিতে নির্বাচন কমিশন (ইসি) জামায়াতের প্রার্থী মাসুদ সাঈদীর আপিল নামঞ্জুর করলে আলমগীর হোসেনই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকে থাকেন। দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে মাসুদ সাঈদী বিএনপির প্রার্থীর বৈধতার বিরুদ্ধে আপিল করেছিলেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) পিরোজপুর জেলা শাখার সভাপতি ও নির্বাচন বিশ্লেষক মনিরুজ্জামান নাসিম আলী বলেন, শুরুতে জাতীয় পার্টির একাংশের চেয়ারম্যান ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ মোস্তফা জামাল হায়দারকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়েছিল। সে কারণে বিএনপি প্রথম ধাপে ২৬৪টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করলেও পিরোজপুর-১ আসনটি শূন্য রাখা হয়। ওই সিদ্ধান্তের পর এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী অনেকেই নির্বাচন থেকে সরে যান। পরে মোস্তফা জামাল হায়দার শারীরিক অসুস্থতার কারণে সরে গেলে বিএনপি আলমগীর হোসেনকে মনোনয়ন দেয়।
অন্যদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে মাসুদ সাঈদী তফসিল ঘোষণার অন্তত এক বছর আগেই মনোনীত ছিলেন। শেষ দিকে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হলে ইসলামী আন্দোলনের জেলা আমির মনোনয়নপত্র জমা দিতে ব্যর্থ হন। এর ফলেই পিরোজপুর-১ আসনে প্রার্থী সংখ্যা এসে দাঁড়ায় দুইজনে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কোথাও অতিরিক্ত প্রার্থী, কোথাও প্রায় একক লড়াই—এই বৈষম্য ভোটের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ভোটার উপস্থিতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। দক্ষিণাঞ্চলের কম ভোটার ও কম প্রার্থীর এই চিত্র নির্বাচনী রাজনীতির একটি ভিন্ন বাস্তবতাকেই সামনে আনছে।