নিজস্ব প্রতিবেদক : বস্তায় আদা চাষ বরিশাল অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। মাত্র ২৫-৩০ টাকা ব্যয় করে একটি বস্তায় দেড় থেকে ৩ কেজি পর্যন্ত আদা উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। ফলে কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন। সারা দেশের সঙ্গে সংগতি রেখে বরিশাল অঞ্চলের কৃষিযোদ্ধারাও বস্তায় আদা চাষে সাফল্য দেখাচ্ছেন। গত কয়েক বছর ধরে বস্তায় আদা চাষে সাফল্যের ধারাবাহিকতায় চলতি বছরও বরিশাল কৃষি অঞ্চলে প্রায় পৌনে ২ লাখ বস্তায় আদা চাষ করছেন এ অঞ্চলের কৃষকরা।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি)-এর বিজ্ঞানীরা বস্তায় আদা চাষের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ‘বারি আদা-১’, ‘বারি আদা-২’ ও ‘বারি আদা-৩’ নামে তিনটি উচ্চ ফলনশীল আদার জাত উদ্ভাবন করেছেন। বস্তাপ্রতি যার উৎপাদন প্রায় দেড় থেকে ৩ কেজি পর্যন্ত।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই)-এর হিসেবে গত বছর দেশে ৬২ লাখ ৭৯ হাজার বস্তায় আবাদের মাধ্যমে ১.৩৯ লাখ টন আদা উৎপাদনের পরে চলতি মৌসুমে ৭৬ লাখ ১৬ হাজার বস্তায় আদা আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যার মাধ্যমে অন্তত ২.৪০ লাখ টন আদা উৎপাদনের আশা করছেন ডিএই-র দায়িত্বশীল মহল।
কৃষিবিদদের মতে, দেশে প্রতিবছর জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে আবাদি জমির পরিমাণও কমছে। ফলে অন্যান্য ফসল আবাদের পরে আদা চাষে জমির পরিমাণ কমছে। তদুপরি রোগবালাইসহ কীটপতঙ্গের আক্রমণে আদার মতো অতি স্পর্শকাতর ফসল আবাদের সুযোগ সীমিত হয়ে আসছে। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই বস্তায় আদা চাষের পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন আমাদের কৃষি বিজ্ঞানীরা। এ পদ্ধতিতে যেকোনো ধরনের বাগানের পাশে, বাড়ির ছাদে বা যেকোনো পতিত ভূমিতে বস্তায় আদা চাষ অত্যন্ত লাভজনক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে এ পদ্ধতির আদা আবাদে কারিগরি জ্ঞানের পাশাপাশি উন্নতমানের বীজ সংগ্রহই এখনো কৃষকের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। কৃষিবিদদের মতে, চাষ অযোগ্য পতিত ভূমি, বসতবাড়ির আশপাশে অব্যবহৃত স্থান ছাড়াও লবণাক্ত এলাকা ও নতুন ফল বাগান এলাকাসহ বাড়ির ছাদেও বস্তায় আদা চাষ সম্ভব।
দেশে বছরে প্রায় ৪.৮৫ লাখ টনের মতো আদার চাহিদার অর্ধেকেরও বেশি আমদানি করতে হয়। ফলে বছরজুড়েই বাজারসমূহে আমদানিকৃত আদায় সয়লাব থাকছে। ভোক্তাদেরও অনেক বেশি দামে আদা সংগ্রহ করতে হচ্ছে। কৃষি বিজ্ঞানীদের মতে, এপ্রিল থেকে মে মাসই হচ্ছে আদা রোপণের উপযুক্ত সময়। এর ফলে জানুয়ারি-মার্চ মাসের মধ্যেই নতুন আদা কৃষকের ঘরে উঠে আসবে।
বরিশাল কৃষি অঞ্চলের প্রধান নির্বাহী ও ডিএই-র অতিরিক্ত পরিচালক ড. নজরুল ইসলাম সিকদার জানান, নতুন এ পদ্ধতিতে আদা চাষকে উৎসাহিত করতে চলতি মৌসুমে অন্তত ২০০টি প্রদর্শনী স্থাপন করা হচ্ছে। এতে করে ওই সব এলাকার সাধারণ কৃষকরা বস্তায় আদা চাষের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে অবহিত হয়ে আগামীতে আরও বেশি করে বস্তায় আদা চাষে মনোযোগী হবেন বলেও জানান তিনি।
তাঁর মতে, বস্তায় আদা চাষে অতি সীমিত পরিমাণে সার প্রয়োগ করতে হয় বিধায় মাটির উর্বরা শক্তি ও তার মূল গুণাগুণ অক্ষুণ্ন থাকে। ডিএই-র অতিরিক্ত পরিচালক জানান, বস্তায় আদা চাষের ক্রমবর্ধমান ধারা ধরে রাখতে পারলে আগামী কয়েক বছর পরে আদার জন্য আমাদের অন্য কোনো দেশের ওপর নির্ভর করতে হবে না। বস্তায় আদা চাষে কৃষকসহ গৃহস্থ পরিবারগুলোকে তিনি স্থানীয় ব্লক সুপারভাইজারদের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দিয়ে এক্ষেত্রে ডিএই-র পক্ষ থেকে সম্ভব সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাসও দেন।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের পাশাপাশি মসলা গবেষণা কেন্দ্রও বস্তায় আদা চাষকে আরও সহজতর ও লাগসই প্রযুক্তিতে টেকসই ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।