নিজস্ব প্রতিবেদক : শরতের এক সকালে গিয়েছিলাম বরিশালের রহমতপুর হর্টিকালচার সেন্টারে। সেখানে পুকুরপাড়ে বসে জলজ আগাছাগুলো পর্যবেক্ষণ করছিলাম। শেওলার সঙ্গে জলঝাঝিগুলো পুকুরের পাড়ে মিলেমিশে বেড়ে উঠেছে। আহা কী চমৎকার! স্থির জলের ওপর ফুটে আছে তারার মতো ছোট ছোট সাদা চাঁদমালা ফুল। চাঁদমালার পাতা শাপলা পাতার মতো। তবে তা আকারে বেশ ছোট ও পাতলা। পাতার ওপরে কয়েকটা রেড পাম্পকিন বিটিল বসে আছে। পাতা ফুটো করে সকালের আহারের ব্যবস্থা করতে ব্যস্ত ওরা। পাশে একটা শাপলা পাতার ওপর বসে আছে ব্যাঙ। অন্যদিকে একটা ঢোড়া সাপ সাঁতরে এপার থেকে ওপারে চলে গেল।
পুকুরপাড়ে বসে জলজ পোকাদেরও খেলা দেখছি। জলের ওপর দিয়ে একটা পোকা লম্বা লম্বা পা ফেলে কী চমৎকার করে হেঁটে যাচ্ছে। আবার সে মাঝে মাঝে দৌড়ে এদিক-ওদিক ছুটছিল। পোকাটা জলে থাকে, তবু তার গায়ে ও পায়ে একটুও জল লাগে না। যেন সে মাটির ওপর দিয়ে চলাফেরা করছে।
ধূসর কালচে দেহের খুবই ছোট, সরু ও হালকা এ পোকাদের ধানমণ্ডি ঝিলের জলেও দেখেছি। ঝিলের ওপর ঝুলে থাকা হিজল গাছটার ছায়াময় জলে ওদের ছোটাছুটিও কম দেখিনি। বোট চালানোর সময় ঝিলের অন্যান্য অংশেও এদের দেখেছি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জনৈক গবেষক বিজন বিহারী রাজশাহী অঞ্চলে জেরিড বাগ পোকা আছে বলে নিশ্চিত করেছেন।
জেরিডি পরিবারের পোকা বলে এদের সাধারণ নাম হয়েছে জেরিড বাগ বা জেসাস বাগ। ভারতীয় লেখক কৌশিক তার একটি বইয়ে এ পোকার বাংলা নাম দিয়েছেন জলমক্ষী। পুকুরে থাকে বলে এদের পন্ড স্কেটার বলে। এ পোকা এক রকমের ওয়াটার বাগ। পানির ওপর দিয়ে স্বচ্ছন্দে এই পোকা হেঁটে বেড়াতে ও দৌড়াতে পারে। এ জন্য এর নাম রাখা হয়েছে ওয়াটার স্ট্রাইডার।
হেমিপ্টেরা বর্গের জেরিডি পরিবারে প্রায় ১ হাজার ৭০০ প্রজাতির পোকা আছে। জেরিড বাগ Limnogonus গণের পোকা। সারা বিশ্বে এই গণে ২৮ প্রজাতির জেরিড বাগ আছে। এর মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ প্রজাতির ওয়াটার স্ট্রাইডার লোনা পানির। বাকিরা স্বাদু পানিতে বাস করে। সুন্দরবনের জীবপরিমণ্ডলেও এরা আছে। বাংলাদেশে প্রধানত Limnogonus fossarum প্রজাতির জেরিড বাগ দেখা যায়। এরা ধানখেতে ও জলাবদ্ধ পানিতে থাকে।
জেরিড বাগ মাঝারি আকারের পোকা। এদের দেহ লম্বাটে ডিম্বাকার। দেহ ৬ থেকে ১২ মিলিমিটার লম্বা হয়। পুরুষ পোকারা স্ত্রীরে চেয়ে ছোট। এদের গায়ের রং কালচে ধূসর। দেহের ওপর হালকা ধূসর বা বাদামি সরু রেখা বা দাগ থাকে। এদের দেহ এক ধরনের সূক্ষ্ম জলনিরোধী পশম দিয়ে আবৃত থাকে। এ কারণে দেহ জলে ভেজে না। এদের ছয়টি পা থাকে। পাগুলো দেহের চেয়ে লম্বা। পিছনের পা জোড়া অনেক লম্বা। মাঝখানের পা জোড়া এরা নৌকার দাঁড়ের মতো ব্যবহার করে। যখন দাঁড়িয়ে থাকে, তখন মাঝখানের পা জোড়া সামনের দিকে প্রসারিত করে রাখে। সামনের পা জোড়া পেছনের ও মাঝখানের পায়ের চেয়ে খাটো। এদের চারটি খণ্ডবিশিষ্ট লম্বা শুঁড় আছে। চোখ গোলাকার ও বড়। এরা স্বভাবে বেশ ভীতু, একটু নড়াচড়া পেলেই দৌড়ে পালায়।
স্ত্রী ওয়াটার স্ট্রাইডার ধানখেতে পানির ওপরে থাকে। সে যেখানে থাকে তার কাছাকাছি ধানগাছের গোড়ার কাণ্ডের ওপরে ১০-৩০টি ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে বাচ্চা বেরিয়েই পানিতে চলাচল শুরু করে।
এই পোকা এক থেকে দেড় মাস বাঁচে। গাছফড়িং ও পাতা ফড়িং, ছোট ছোট মথ ও কিড়াসহ অন্য পোকার চলাচলের সময় যখন ধানগাছ থেকে পানিতে পড়ে যায়, তখন বাচ্চা ও পূর্ণবয়স্ক ওয়াটার স্ট্রাইডার তাদের শিকার করে খায়। এ কারণে এদের বলা হয় কৃষকের বন্ধু পোকা। একটি ওয়াটার স্ট্রাইডার দিনে গড়ে ৫-১০টি পোকা খেতে পারে।
লেখার শেষ দিকে এসে ভাবলাম, ওরা তো পানিতে থাকে, পানির ওপর হেঁটে ও দৌড়ে চলাচল করে। তাহলে ওদের পাখার কাজটা কী? বইপত্র ঘাঁটতে ঘাঁটতে সে উত্তরও পেয়ে গেলাম। কারণটা খুবই সাধারণ, তবে সেটা আমার মাথায় আসেনি। ওদের চারটি ডানা আছে। ওরা উড়তে পারে। কিন্তু ইচ্ছে করে ওড়ে না। তবে যখন ওদের আবাসস্থলের জল শুকিয়ে যায়, তখন তারা উড়ে অন্য জায়গায় চলে যায়। নতুন জলাশয়, নতুন আশ্রয় খুঁজে সেখানে বসতি গাড়ে।
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ