অনলাইন ডেস্ক : সংখ্যা কখনো শুধু সংখ্যা থাকে না। সঠিক অনুপাতে বসালে তা গল্প হয়ে যায়। জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য তিনবারের সংসদ সদস্য গোলাম কিবরিয়া টিপুর তিনটি সংসদ নির্বাচনের হলফনামা পাশাপাশি রাখলে ঠিক সেই গল্পটাই ধরা পড়ে।
ক্ষমতার পাঁচ বছরে ২০০ শতাংশের বেশি আয় বেড়েছিল।
আওয়ামী লীগের শরিক টিপু এখন জেলে রয়েছেন। সেখানে থেকেই বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী) আসনে নির্বাচন করছেন তিনি। এবার দাখিল করা হলফনামায় তার আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ কমেছে। বরিশাল জেলার সবচেয়ে সম্পদশালী প্রার্থী টিপুর ২০১৮ সালের আয়ের সঙ্গে ২০২৫ সালের আয় তুলনা করলে দেখা যায়, সাত বছরে তার আয় কমেছে প্রায় ৩৭ শতাংশ।
পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০১৮ সালের নির্বাচনে টিপু যে হলফনামা দেন, সেখানে তার বার্ষিক আয় ছিল ছয় কোটি ১০ লাখ টাকার কিছু বেশি। পাঁচ বছর পর, ২০২৩ সালের হলফনামায় গিয়ে সেই আয় দাঁড়ায় ১৮ কোটি ৭৭ লাখ টাকায়। হিসাব বলছে, এই সময়ের মধ্যে তাঁর আয় বেড়েছে প্রায় ২০৮ শতাংশ। সহজ কথায়, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে টিপুর আয়ের পরিমাণ একাদশ নির্বাচনের চেয়ে তিন গুণেরও বেশি ছিল।
অর্থনীতিবিদদের মতে, পাঁচ বছরের ব্যবধানে এই আয় বাড়ার ভেতরের কাঠামোটি ছিল আরো তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৩ সালে শেয়ার ও সঞ্চয়পত্র থেকে আয়ের প্রায় ৭৮ শতাংশ আসে। তখন ব্যবসা বা অন্য খাতগুলো গৌণ ছিল। অর্থাৎ আয়ের বড় অংশই ছিল আর্থিক খাতনির্ভর, যার স্বভাবগত বৈশিষ্ট্যই হলো অস্থিরতা। কারণ শেয়ার নিয়ে দেশে অনেক অঘটনের কথা কারোর অজানা নেই।
ওই অস্থিরতার প্রতিফলন দেখা যায় ২০২৫ সালের হলফনামায়। সেখানে টিপুর বার্ষিক আয় নেমে আসে তিন কোটি ৮৫ লাখ ৫০ হাজার টাকায়। শেয়ার ও সঞ্চয়পত্র থেকে ২০২৩ সালের তুলনায় আয় প্রায় ৭৯ শতাংশ কমে আসে। শতাংশের হিসাবে দেখলে, মাত্র দুই বছরে চার ভাগের তিন ভাগ আয় উধাও হয়েছে, যেটা এ বছর দাখিল করা হলফনামায় উল্লেখ করেছেন তিনবারের সংসদ সদস্য টিপু।
আরো বিশ্লেষণ করলে দেখলে দেখা যায়, ২০২৫ সালের মোট আয়ের মধ্যে ব্যবসা থেকে আসে প্রায় ৬৭ শতাংশ, ভাড়া থেকে প্রায় ১০ শতাংশ এবং অন্যান্য উৎস থেকে প্রায় ২৩ শতাংশ। কিন্তু ২০২৩ সালে যে শেয়ার ও সঞ্চয়পত্র থেকে মোট আয়ের প্রায় চার ভাগের তিন ভাগ এসেছিল, সেই খাতের অবদান কার্যত শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।
আয় কমলেও বাড়ছে অস্থাবর ও স্থাবর সম্পদ
আয়ের এই পতনের বিপরীতে সম্পদের চিত্র ভিন্ন কথা বলছে। ২০২৫ সালের হলফনামা অনুযায়ী টিপুর নিজের নামে অস্থাবর সম্পদের মূল্য দেখানো হয়েছে প্রায় ৩৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে রয়েছে বিপুল অঙ্কের শেয়ার, ব্যাংক আমানত, স্থায়ী আমানত, গাড়ি, সোনা ও আগ্নেয়াস্ত্র। স্ত্রীর নামেও অস্থাবর সম্পদ দেখানো হয়েছে প্রায় ছয় কোটি টাকার। শেয়ার, ব্যাংক জমা এবং স্বর্ণালংকার মিলিয়ে স্ত্রীর সম্পদের পরিমাণ আগের হলফনামাগুলোর তুলনায় বেড়েছে।
স্থাবর সম্পদের ক্ষেত্রেও বিস্তার লক্ষণীয়। টিপুর নিজের নামে রয়েছে ১০ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের কৃষিজমি এবং ৯টি বাড়ি ও অ্যাপার্টমেন্ট, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১৮ কোটি টাকা। স্ত্রীর নামেও কৃষিজমি ও একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে, যেগুলো তিনি হেবা দলিলের মাধ্যমে পেয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
নগদ কম, বিনিয়োগ বেশি
২০১৮ সালে টিপুর নগদ অর্থ ও ব্যাংক জমার পরিমাণ তুলনামূলক কম ছিল। ২০২৩ সালে এসে ব্যাংক, বন্ড ও সঞ্চয়পত্রে তাঁর বিনিয়োগ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। সবশেষ হলফনামায় নগদ অর্থের পরিমাণ তুলনামূলক কম হলেও শেয়ার, স্থায়ী আমানত ও স্থাবর সম্পদের অঙ্ক অনেক বেশি। ২০২৫ সালের হলফনামায় শেয়ার ও স্থায়ী আমানতের অঙ্ক আগের বছরের তুলনায় বড় হলেও সেখান থেকে আয়ের পরিমাণ তুলনামূলক কম দেখানো হয়েছে।
রাজনৈতিক উত্থান
টিপুর রাজনীতি শুরু আওয়ামী লীগের মাধ্যমে; তিনি রমনা থানা যুবলীগের সহ-সভাপতি ছিলেন। পরে বিএনপিতে যোগ দিয়ে স্বেচ্ছাসেবক দলের ঢাকা মহানগরীর সাধারণ সম্পাদক এবং কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি হয়েছিলেন। আশির দশকে তিনি জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন এবং প্রেসিডিয়াম সদস্য হন। ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-৩ আসন থেকে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে মহাজোটের হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনে একই আসন থেকে আবার সংসদ সদস্য হন।
তারই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-৩ আসন থেকে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগের সমর্থনে নির্বাচিত হলেও ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর সংসদ বিলুপ্ত হওয়ায় তিনি সংসদ সদস্য পদ হারান। ওই ঘটনার পর তিনি ঢাকায় গ্রেপ্তার হন। বর্তমানে তিনি জেলে রয়েছেন। তবে জেলে থেকেই জাতীয় পার্টির হয়ে নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন।