নিজস্ব প্রতিবেদক : জলবায়ু পরিবর্তনের প্রথম ও সবচেয়ে নির্মম আঘাত যেসব জেলায় পড়ছে, বরগুনা তার অন্যতম। বিষখালী, পায়রা ও বলেশ্বর নদীবেষ্টিত এই উপকূলীয় জেলায় নদীভাঙন এখন আর মৌসুমি দুর্যোগ নয়-এটি মানুষের নিত্যদিনের আতঙ্ক। প্রতিটি বর্ষা, প্রতিটি জোয়ারে কেবল মাটি নয়, ভেঙে পড়ছে মানুষের স্বপ্ন, ঘরবাড়ি ও নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা।
পায়রা, বিষখালী ও বলেশ্বর নদীর তীব্র ভাঙনে প্রতি বছর হাজার হাজার পরিবার গৃহহীন হচ্ছে। ফসলি জমি, বসতভিটা ও বাজার নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। প্রায় দুই কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এখন চরম ঝুঁকিতে, যার ফলে আবাসন প্রকল্প, খাদ্যগুদামসহ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনাও হুমকির মুখে। শুষ্ক মৌসুমেও ভাঙন অব্যাহত থাকায় উপকূলজুড়ে আতঙ্ক যেন স্থায়ী রূপ নিয়েছে।
আমতলী, তালতলী ও পাথরঘাটা উপজেলার বহু গ্রামের মানুষ আজ কার্যত ‘ভাসমান নাগরিক’। পায়রা নদীর তীরবর্তী তালতলী উপজেলার চরপাড়া ও নিশানবাড়িয়া গ্রামে কয়েক বছরের ব্যবধানে বহু পরিবার তিন থেকে চারবার ঘর সরাতে বাধ্য হয়েছে। একসময়ের সবুজ ভিটেমাটি, ফলের গাছ আর উঠান এখন উত্তাল নদীর স্রোতে হারিয়ে গেছে।
ভাঙনকবলিত বুড়িরচর গ্রামের ষাটোর্ধ্ব আব্দুল লতিফ হাওলাদার বলেন, পঞ্চাশ বছরের স্মৃতিবহুল ভিটেমাটি নদী কেড়ে নিয়েছে সবকিছু। এখন বাঁধের ওপর ঝুপড়ি তুলে বেঁচে থাকাই তাঁর জীবনের বাস্তবতা। একটি স্থায়ী ঠিকানার আকুতি তাঁর শেষ চাওয়া।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, জোয়ারের পানি আগের চেয়ে অনেক উঁচুতে উঠে আসছে এবং ভাঙন হচ্ছে হঠাৎ ও গভীরভাবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টি ও ঘূর্ণিঝড় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে আরও তীব্র করেছে। এর সঙ্গে অপরিকল্পিত নদীশাসন ও দুর্বল বাঁধ পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
জেলা ছিন্নমূল বাস্তুহারা সমিতির নেতারা বলছেন, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত অনেক মানুষ সরকারি তালিকার বাইরে রয়ে গেছে। পুনর্বাসন নিশ্চিত না হলে এই মানুষগুলো শহরমুখী হয়ে বস্তিজীবনে ঠাঁই নিতে বাধ্য হবে, যা ভবিষ্যতে বড় সামাজিক সংকট তৈরি করতে পারে।
নদীভাঙনের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষিজমি ও জীবিকা। জমি হারিয়ে অনেকেই কৃষিকাজ ছেড়ে দিনমজুরি কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় জড়াচ্ছে। শিশুদের শিক্ষা ব্যাহত হচ্ছে, নারীরা পড়ছে চরম নিরাপত্তাহীনতায়। সরকারি সহায়তা থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলে অভিযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বরগুনার নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আব্দুল হান্নান প্রধান জানান, পায়রা ও বিষখালী নদীর ভাঙন অত্যন্ত জটিল প্রকৃতির। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পর্যায়ক্রমে টেকসই বাঁধ ও প্রতিরক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য বড় বরাদ্দ ও সমন্বিত পরিকল্পনা জরুরি।
বরগুনার উপকূল ভাঙনের এই গল্প শুধু একটি জেলার নয়- এটি জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক বাস্তবতার নির্মম দলিল। এখনই কার্যকর ও মানবিক উদ্যোগ না নিলে মানচিত্রে নয়, বাস্তব জীবন থেকেই হারিয়ে যাবে আরও অনেক মানুষের শেষ ঠিকানা।