নিজস্ব প্রতিবেদক : প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জল-সম্পদে সমৃদ্ধ উপকূলীয় জেলা বরগুনা একসময় নদী, খাল ও বিলের জালের জন্য পরিচিত ছিল। এসব জলাধার জেলার কৃষি, যোগাযোগ ও পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। তবে অবৈধ দখল, নির্বিচার ভরাট ও দূষণের কারণে একের পর এক খাল-বিল আজ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। দখলদারদের আগ্রাসনে হারিয়ে যাচ্ছে প্রাকৃতিক জলাধার, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পরিবেশ, কৃষি ও জনজীবনে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বরগুনা সদর, পাথরঘাটা, বেতাগী, আমতলী ও তালতলী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এক সময়ের খরস্রোতা খালগুলো মাটি ফেলে ভরাট করে দখল করা হয়েছে। কোথাও গড়ে উঠেছে দোকানপাট ও বসতবাড়ি, কোথাও মাছের ঘের কিংবা স্থাপনা। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় প্রভাবশালী মহল দীর্ঘদিন ধরে এসব দখল কার্যক্রম চালিয়ে এলেও কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, বরগুনা জেলায় একসময় তিন শতাধিক প্রাকৃতিক খাল ছিল। কালের বিবর্তন ও দখল-ভরাটের ফলে বর্তমানে অধিকাংশ খাল কেবল কাগজে-কলমেই অস্তিত্বশীল। বাস্তবে অনেক খালের কোনো চিহ্নই পাওয়া যায় না। যেগুলো এখনো টিকে আছে, সেগুলোর বড় অংশই প্রভাবশালীদের দখলে।
একসময় বরগুনা সদরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ছিল ভাড়ানী খাল। খালটির প্রস্থ ছিল বর্তমানের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি। স্থানীয়রা পালতোলা নৌকা ও লঞ্চে করে হাটবাজার ও বন্দরে যাতায়াত করতেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দখল ও ভরাটের ফলে সেই খাল আজ মৃতপ্রায় নালায় পরিণত হয়েছে।
বরগুনা সদর উপজেলার বাওয়ালকর গ্রামের বৃদ্ধ আসমত আলী সিকদার জানান, আগে খাল-বিল বর্ষায় অতিরিক্ত পানি ধারণ করত এবং শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজে ব্যবহার করা যেত। বর্তমানে খাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়, ফসল নষ্ট হয় এবং বসতঘরে পানি ঢুকে পড়ে।
পাথরঘাটার কালমেঘা ইউনিয়নের কৃষক ইব্রাহিম খলিফা বলেন, খাল থাকলে জমির পানি সহজেই নেমে যেত। এখন খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় ধান রোপণ করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
বরগুনা পৌর এলাকার বাসিন্দা আদম আলী মৃধা জানান, অপরিকল্পিত দখলের কারণে শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
বরগুনার পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা ধরা’র সদস্য সচিব সাংবাদিক মুশফিক আরিফ বলেন, খাল-বিল ধ্বংস মানেই প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্ট হওয়া। এতে মাছের প্রজনন ক্ষেত্র নষ্ট হচ্ছে এবং জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত বরগুনার জন্য এটি আরও ভয়াবহ বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, মাঝে মধ্যে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হলেও তা স্থায়ী সমাধান দিতে পারছে না।
বরগুনা প্রেসক্লাব ও জেলা ভূমি কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক আবু জাফর মো. সালেহ বলেন, রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে দখলদাররা বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে। দ্রুত খাল-বিলের সীমানা নির্ধারণ করে স্থায়ীভাবে দখলমুক্ত না করলে ভবিষ্যতে বরগুনা ভয়াবহ পরিবেশ ও পানিসংকটে পড়বে। এ জন্য নিয়মিত নজরদারি, কঠোর আইন প্রয়োগ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর তিনি জোর দেন।
নদী ও সাগরবেষ্টিত বরগুনা জেলায় প্রায় ৩০০টি প্রাকৃতিক খাল রয়েছে। এসব খাল জেলার কৃষি, যোগাযোগ এবং পরিবেশ রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উল্লেখযোগ্য খালের মধ্যে রয়েছে—ভাড়ানী খাল, যা বরগুনা শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে খাকদোন নদ ও পায়রা নদীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেছে। ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই খালটি একসময় নৌ-বাণিজ্যের প্রধান মাধ্যম ছিল এবং বর্তমানে এটি দখলমুক্ত করে পুনঃখনন করা হয়েছে।
আমতলী উপজেলার প্রায় ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সুবন্ধী খাল প্রায় ২০টি গ্রামের মানুষের কৃষিকাজ ও যোগাযোগের প্রাণকেন্দ্র। তালতলী উপজেলার টেংরাগিরি ইকো-পার্কের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত সখিনা খাল পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয়। এছাড়া তালতলীর নিদ্রা খাল, বেতাগীর কাবিল আকন খাল, বগীর খাল, আমতলী খাল ও টিয়াখালী খালও জেলার গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক জলাধার।
বরগুনার অধিকাংশ খাল পায়রা, বিষখালী, বলেশ্বর ও হরিণঘাটা নদীর শাখা হিসেবে বিস্তৃত। জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড পরিবেশ ও নৌ-যোগাযোগ রক্ষায় এসব খাল পুনঃখনন ও সংরক্ষণে কাজ করলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উল্লেখযোগ্যভাবে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে খাল খনন কর্মসূচির আওতায় বরগুনায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ খাল খনন করা হয়। একটি বুড়িরচর ইউনিয়নের সোনাখালি থেকে চরগাছিয়া পর্যন্ত এবং অন্যটি বরগুনা সদর ইউনিয়নের ক্রোক খাল। এসব খাল খননের ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় কৃষিতে ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়, যার সুফল আজও দৃশ্যমান। স্থানীয়দের মতে, এ ধরনের খাল পুনঃখনন কর্মসূচি বিস্তৃত করা গেলে গোটা বরগুনা জেলায় কৃষিতে নতুন বিপ্লব ঘটতে পারে।
স্থানীয়দের অভিমত, প্রাকৃতিক খাল-বিল রক্ষা কেবল পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয় নয়-এটি বরগুনার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রশ্ন।