নিজস্ব প্রতিবেদক : সকালের নরম রোদে শিমক্ষেত সবুজ হওয়ার কথা ছিল। ফুলে ভরা গাছে গাছে দুলবে সবুজ শিম। কিন্তু বরগুনার তালতলী উপজেলার সওদাগার পাড়া সবজি পল্লীতে এখন সবুজের বদলে কেবল হলুদ আর হলুদ। পাতা হলুদ, ফুল হলুদ, শিমও হলুদ। গাছের ডগা ঝুলে আছে নিস্তেজ হয়ে। যেন এক অদৃশ্য রোগ পুরো গ্রামটাকেই গ্রাস করেছে।
এই নিঃশব্দ দুর্যোগের নাম— ‘মোজাইক’ ভাইরাস।
ক্ষেতের আইলে দাঁড়িয়ে শুকিয়ে যাওয়া শিম গাছ ছিঁড়ছিলেন কৃষক আব্দুল মন্নান ফকির। চোখেমুখে ক্লান্তি, কণ্ঠে হতাশা। তিনি বলেন, “এই জমিটা ছিল আমার শেষ ভরসা। প্রতি বছর এই শিম বিক্রির টাকায় সংসার চলত। এবার সব শেষ।
এক একর জমিতে আগাম শিম চাষ করতে তার খরচ হয়েছিল প্রায় দেড় লাখ টাকা। গাছগুলোতে ফুল এসেছিল, কিছু গাছে শিমও ধরেছিল। আশা করেছিলেন এবার ভালো লাভ হবে। কিন্তু হঠাৎ করেই ভাইরাসের আক্রমণ। কয়েকদিনের মধ্যেই সবুজ ক্ষেত হলুদ হয়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, “নিজের জমি নাই। এক একর জমি বন্দোবস্ত নিয়ে চাষ করছি। এখন জমির মালিকরে কী দিমু? আর আমার ছাওয়াপোলাপান নিয়া ক্যামনে চলমু? সরকার যদি সাহায্য না করে, আমরা বাঁচমু না।
আব্দুল মন্নান একা নন। সওদাগার পাড়া সবজি পল্লীর তিন শতাধিক কৃষক একই দুর্দশার মুখে। কেউ কেউ জমি বন্ধক রেখে, কেউ ধার করে শিম চাষ করেছিলেন। এখন তাদের সামনে শুধুই অনিশ্চয়তা।
বরিশাল বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শিম উৎপাদন হয় এই গ্রামেই। প্রতি বছর এখানকার কৃষকরা জেলার চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ৬ থেকে ৭ কোটি টাকার শিম সরবরাহ করেন। চলতি মৌসুমে সমবায় পদ্ধতিতে প্রায় ২২ একর জমিতে শিম আবাদ হয়েছিল।
কিন্তু এ বছর ‘মোজাইক’ ভাইরাসের আক্রমণে সেই সম্ভাবনার রাজ্যই এখন লোকসানের অঙ্কে পরিণত হয়েছে। চাষিরা আশঙ্কা করছেন, ক্ষতির পরিমাণ ছাড়িয়ে যাবে ৭ কোটি টাকা।
কৃষক সেলিম মিয়া বলেন, “আমাদের এলাকার মানুষ কৃষির ওপরই নির্ভরশীল। ভাইরাস ধরার পর নিজের টাকায় ওষুধ দিয়েছি। শুনেছি সরকারি সাহায্য আসবে, কিন্তু কেউ আসেনি। আমার এক লাখ টাকা খরচ, অথচ ১৫ হাজার টাকার শিমও বিক্রি করতে পারব কিনা জানি না।
একই হতাশার সুর শোনা যায় কৃষক জসিম শিকদারের কণ্ঠে। “প্রতিবছর এই গ্রামে শিম থেকে কোটি টাকার বাণিজ্য হতো। এবছর পুরো গ্রামটাই যেন অসুস্থ। এমন অবস্থা যে, আমাদের সবাইকেই পথে বসতে হবে।
কৃষক মো. নাসির বলেন, “চাষের খরচও উঠবে না। কৃষিতে যে টাকা ঢেলেছি, তার একাংশও ফিরবে না।
কৃষকদের অভিযোগ, সময়মতো কার্যকর পরামর্শ ও মাঠপর্যায়ে সহায়তা পেলে এত বড় ক্ষতি হতো না। শুরুতেই যদি রোগ শনাক্ত ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া যেত, তাহলে পরিস্থিতি এত ভয়াবহ হতো না বলে মনে করছেন তারা।
এ বিষয়ে বরগুনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক রথীন্দ্র নাথ বিশ্বাস বলেন, “শিম গাছ হলুদ হয়ে যাওয়ার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাঠে কর্মকর্তা পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ‘মোজাইক’ ভাইরাসের কারণেই এই সমস্যা।”
তিনি জানান, আক্রান্ত গাছের নমুনা সংগ্রহ করে পটুয়াখালী কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়েছে। “একই জমিতে বারবার একই সবজি চাষ করলে ভাইরাসের ঝুঁকি বাড়ে। ফসল পরিবর্তন করলে এ ধরনের রোগ অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব। সরকারিভাবে প্রণোদনা পাওয়া গেলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা করা হবে।
সওদাগার পাড়ার শিম শুধু একটি ফসল নয় এটি এখানকার মানুষের জীবন, স্বপ্ন আর টিকে থাকার লড়াই। এই শিমের আয়েই চলে সংসার, পড়াশোনা, চিকিৎসা। আজ সেই শিমই যখন রোগাক্রান্ত, তখন পুরো গ্রামজুড়ে নেমে এসেছে নীরব শোক।