1. diggilseba@gmail.com : admin :
  2. ashadul@barisalcrimetrace.com : Ashadul Islam : আসাদুল ইসলাম
  3. hafiz@barisalcrimetrace.com : barisal CrimeTrace : barisal CrimeTrace
  4. mahadi@barisalcrimetrace.com : মাহাদী হাসান : মাহাদী হাসান
চন্দ্রদ্বীপ থেকে প্রাচ্যের ভেনিস : যা বর্তমানে বরিশাল শহর - বরিশাল ক্রাইম ট্রেস
শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:১৯ অপরাহ্ন
শিরোনাম
মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভরাডুবির পর আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারেন ট্রাম্প বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালে ৩ হাজার রোগীর খাবার বন্ধের শঙ্কা দীর্ঘ রাজনৈতিক ত্যাগের পরও অপপ্রচারের শিকার আলবার্ট রিপন বল্লভ এবার তালাক নোটিশ ও কথিত কাবিননামা প্রকাশ করলেন গোলাম মাওলা রনি পাহাড়ে মানবপাচারকারীদের সঙ্গে গোলাগুলি, সেনাসদস্য গুলিবিদ্ধ জামায়াতের সঙ্গে জোটে আপত্তি, এনসিপি ছাড়ছেন নেত্রীরা স্কুলে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান, ৯ শিক্ষার্থীকে টিসি পোশাকশ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণে দ্বিতীয় বৈঠক সোমবার এইচএসসিতে শূন্য পাস, পাঁচ বছরের নথিসহ ২৬ অধ্যক্ষকে তলব বালু অপসারণের নামে কেটে নেওয়া হচ্ছে ফসলি জমি

চন্দ্রদ্বীপ থেকে প্রাচ্যের ভেনিস : যা বর্তমানে বরিশাল শহর

  • আপডেট সময় : রবিবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২৬
জয়নুল আবেদীন : চন্দ্রদ্বীপ ছিল বাংলার একটি প্রাচীন রাজ্য, যা বর্তমানে বরিশাল শহর। বরিশাল তার অসংখ্য খাল ও নদীর কারণে ইতালির ভেনিস শহরের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ায় একে বলা হয় ‘প্রাচ্যের ভেনিস’ বা ‘বঙ্গের ভেনিস’। চন্দ্রদ্বীপ ছিল একটি শক্তিশালী হিন্দু রাজ্য, যা তার নদী ও খালের জন্য মুসলিম আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত ছিল এবং বঙ্গজ কায়স্থ শাসকদের অধীনে ছিল। এই অঞ্চলটি বাগেরহাট, গোপালগঞ্জ এবং মাদারীপুর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। যা নদী ও খালের এক জটিল নেটওয়ার্ক দ্বারা বেষ্টিত। কাজী নজরুল ইসলাম বরিশালের খাল ও নদীর সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়ে একে ‘প্রাচ্যের ভেনিস’ উপাধি দেন। ভেনিস ইতালির একটি বিখ্যাত শহর। এ শহর খাল, সেতু এবং নৌযানের জন্য পরিচিত। শহরটি ইতালির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে, অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের তীরে অবস্থিত। এটি ১১৮টি ছোট দ্বীপের ওপর নির্মিত, যেখানে সড়কের পরিবর্তে রয়েছে খাল আর সেতু। ‘গন্ডোলা’ নামে পরিচিত এক প্রকার নৌকা এখানকার প্রধান বাহন। একে ‘ভাসমান শহর’ও বলা হয়। স্কুলজীবনে পড়েছি ‘ধান নদী খাল এই তিনে বরিশাল’। বঙ্গোপসাগরের তীরে বরিশাল বিভাগে রয়েছে অসংখ্য নদী, খাল ও সেতু। পণ্যের প্রধান বাহন ও বেচাকেনা নৌকায়। বরিশাল বিভাগের ঝালকাঠি ও পিরোজপুরের ভীমরুলি, আটঘর, কুড়িয়ানা ও বানারীপাড়া এলাকার শত বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী পেয়ারা, আমড়া, ধান ও চাল বেচাকেনার জন্য রয়েছে ভেনিসের মতো অসংখ্য ভাসমান হাট। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ায় বিদেশি পর্যটকরাও ছুটে আসেন এই ভাসমান হাট দেখার জন্য। ইতালির আদলে একেকটি নৌকাই যেন, একেকটি ভাসমান হাট। তাই এলাকার আরেক নাম ‘বঙ্গের ভেনিস’। শত বর্ষের পুরনো এই হাট ‘নগদের হাট’ নামেও পরিচিত। কারণ এখানে নগদ টাকায় লেনদেন হয়। বিশেষ করে বর্ষাকালে (জুন-আগস্ট) আমড়া, পেয়ারার মৌসুমে জমজমাট হয়ে ওঠে ভাসমান হাট।

শৈশবে ঘুমানোর আগে, দিদিমার কাছে শুনতাম “দেশের দক্ষিণে লমলমা সাগর। যে সাগরের কোনো কূলকিনারা নেই। সাগরের ওই পাড়ে আছে একটা ভয়ংকর রাক্ষস। রাক্ষসের সামনে একটা বড় পাথর। রাক্ষস পাথরটা লেহন করে করে খায়। লেহনে লেহনে পাথরটা যখন একেবারে ছোট হয়ে পড়ে, তখনই পাথর খাওয়ার আশা বাদ দিয়ে সে সাঁতার দেয়। অর্ধেক সাগর সাঁতরানোর পর, ‘আবার আসবে’ বলে ফিরে যায়। ফিরে গিয়ে দেখে, পাথরটা অগের মতো বড় হয়ে গেছে। আবার নতুন করে লেহন শুরু। তাই আর সাগর সাঁতরানো শেষ হয় না। লেহন করতে করতে যেদিন পাথরটা একেবারে শেষ হয়ে যাবে, সেদিনই রাক্ষসটা সাঁতরিয়ে সাগরের এই পাড় চলে আসবে। রাক্ষস যেদিন এই পাড় চলে আসবে সেদিন মানুষসহ জীবজন্তু সব খেয়ে শেষ করে ফেলবে।” রাজধানীর সঙ্গে দক্ষিণের লঞ্চ চলাচল সহজ হওয়ায় কল্পজগতের রাক্ষস-খোক্কসের চিন্তা মন থেকে দূর হয়। ১৪ ডিসেম্বর ২০১২ তারিখে এক সন্ধ্যায় রওনা হই। সদরঘাট গিয়ে দেখি, লঞ্চের সংখ্যার তুলনায় যাত্রী কম। ডেকে জনপ্রতি ভাড়া ছিল ২০০ টাকা। ঢাকা থেকে বরিশালের উদ্দেশে এমভি পারাবত ১০, সুন্দরবন ১০, সুরভীসহ আরও কয়েকটি লঞ্চের কর্মচারীরা ‘ডেকে একশ’ ‘ডেকে একশ’ বলে যাত্রী ডাকাডাকি শুরু করেন। প্রায় একই সময়ে ঢাকা ছাড়ে দক্ষিণাঞ্চলগামী সব কয়টা লঞ্চ। রাতে চা খাওয়ার জন্য ডেকে নেমে দেখি, এলাহি কান্ড। শত শত নারী-পুরুষ। আলাদা আলাদা এবং পরিবার-পরিজনসহ। কিছু দূর পরপর ঝুলছে টিভি। কেউ ঘুমাচ্ছে, কেউ গল্প করছে, লুুডু খেলছে, জোটবদ্ধ হয়ে তাস খেলছে কোথাও কোথাও।

মাত্র একশ টাকায় এত রকমের বিনোদনসহ এমন ঘুমের স্থান কোনো দেশে আর কোথাও পাওয়া যাবে না। একশ টাকা যদি ঘুমের মাশুল হয়ে থাকে, তবে লঞ্চ ভাড়া ও বিনোদন ফ্রি কিংবা একশ টাকা যদি লঞ্চভাড়া হয়ে থাকে, ঘুমের মাশুল ফ্রি। ক্যাবিনের পাশে লঞ্চের আঙিনায় বসে রাতের আকাশ, নির্জন নদী ও দূরের বাতি দেখেছি গভীর রাত পর্যন্ত। লঞ্চের ঝিরিঝিরি শব্দে ঘুম এসেছিল। ঘুম ভাঙতেই দেখি বরিশাল লঞ্চ টার্মিনাল। বেশ কিছু দিন অবস্থান করে জীবনানন্দ দাশ, সুফিয়া কামাল, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, কামিনী রায়, আরজ আলী মাতুব্বর, বিজয় গুপ্ত, কুসুমকুমারী দাশ (জীবনানন্দ দাশের মা), আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, আহসান হাবীব, আবুল হাসান, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক এসব ব্যক্তিদের সাধনা ও স্থাপত্যের সঙ্গে পরিচয় হলেও বঙ্গের ভেনিস সম্পর্কে ধারণা ছিল না। গত ৮ জানুয়ারি ২০২৬ সকাল ৭টায় ঢাকার দোলাইরপাড় থেকে গ্রিন লাইনে ওঠে পড়ি। কুয়াশার কারণে বাস কখন পদ্মা সেতু পাড় হয় টের পাইনি। দুই ঘণ্টা পার হতেই না হতেই বাস পৌঁছে যায় বরিশাল গেট রেস্টুরেন্ট। রেস্টুরেন্টের নাম বরিশাল হলেও স্থানটা মাদারীপুর। মাদারীপুর থেকে অর্ধ ডজন নদী ও খাল পাড় হয়ে বেলা ১১টার মধ্যে পৌঁছে যাই বরিশাল। দুপুরের লাঞ্চ শেষ করে বেলা ৩টায় বের হই, আদমকাঠি পেয়ারা পার্কের উদ্দেশে। আদমকাঠি পিরোজপুর জেলার নেছারাবাদ কুড়িয়ানা এলাকায়। যাওয়ার পথে জানা যায়, ‘শত বছরেরও বেশি সময় ধরে আটঘর কুড়িয়ানায় চাষ হচ্ছে স্থানীয় জাতের পেয়ারা। যা সারাদেশে বাংলার আপেল নামে সুপরিচিত। জুন থেকে শুরু হয়ে পরবর্তী ৫ মাস চলে বাগান থেকে পেয়ারা সংগ্রহ। এ মৌসুমে সহজে পথ চলাসহ ফলফলাদি বহনের প্রধান বাহক হিসেবে ব্যবহৃত হয় নৌকা। ছোট ছোট নৌকায় করে বাগান থেকে পেয়ারা সংগ্রহ করে নিয়ে আসা হয় বিভিন্ন খালের মুখে ভাসমান হাটে। সেখান থেকে বড় ট্রলার, ট্রাক ও লঞ্চযোগে পাঠানো হয় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। বাগানে থোকায় থোকায় ঝোলা পেয়ারা আর ভাসমান হাট দেখতে প্রতি বছর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ ঘুরতে আসে। এখানে এসে তারা ট্রলার অথবা নৌকা ভাড়া করে পেয়ারা বাগানে ঘুরে বেড়ায়। তাদের যথাযথ বিনোদনের জন্য উপজেলার আদমকাঠি গ্রামে ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে উঠেছে পেয়ারা পার্ক। সেখানে রয়েছে খাবারসহ পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা। কেউ সেখানে রাত যাপন করতে চাইলেও তার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা রয়েছে।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে প্রকাশ, উপজেলার ৪টি ইউনিয়নের ১ হাজার ৬শ একর জমিতে স্থানীয় জাতের পেয়ারা চাষ হয়। উপজেলার আটঘর, কুড়িয়ানা, জিন্দাকাঠি, কঠুরাকাঠি, আতা ও মাদ্রাসহ ২৬টি গ্রাম পেয়ারা চাষে জড়িত। ২ হাজার ২৫টি পেয়ারা বাগানের সঙ্গে সরাসরি জড়িত রয়েছে প্রায় দেড় হাজার পরিবারের ৫ সহস্রাধিক সদস্য। পেয়ারার ফলন ভালো হলে হেক্টরপ্রতি উৎপাদন হয় ৮-৯ মেট্রিক টন। যাওয়ার পথে বেশ কয়েকটি নদী, অসংখ্য খাল, ধানি জমি ও জলাশয় চোখে পড়েছে। কোনো জলাশয় ভরাট হতেও দেখেছি। চলছে নতুন নতুন নির্মাণকাজ। জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে বাড়িঘর বাড়ছে। কিন্তু একই সঙ্গে ব্যাপকহারে ফসলি জমি কমে যাচ্ছে, যা স্থানীয় কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তায় ঝুঁকি তৈরি করছে। যদিও উন্নত প্রযুক্তি ও প্রণোদনার কারণে কিছু ক্ষেত্রে উৎপাদন বেড়েছে, তবুও কৃষিজমি সংকোচন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ভীমরুলি পৌঁছার আগেই বাম দিকে চোখ পড়তেই দেখি, পুষ্পপল্লবহীন গাছ। এ রকম পুষ্পপল্লবহীন গাছ বরফের দেশ ছাড়া চোখে পড়ে না। জানতে পারি, এসব আমড়া বাগান। কয়েক একর স্থান জুড়ে একেকটা বাগান। বর্ষায় ফল দিয়ে শীতের শুরুতেই পাতা ঝরে গেছে, এখন কা-ের ওপর শুধু ডালপালা।

এখানে একসময় একটি শক্তিশালী হিন্দু রাজ্য ছিল, সেই এলাকাটা কোথায়? আমাদের সঙ্গে ছিলেন কুড়িয়ানা ক্যাম্পের এএসআই মো. জহিরুল হক মিলন। তিনি বলেন, ‘চন্দ্রদ্বীপ’ নামে দক্ষিণ বাংলায় একটি ঐতিহাসিক হিন্দু রাজ্য ছিল। যা মূলত বর্তমান বরিশাল। এর মধ্যে, ‘নেছারাবাদ একটি ঐতিহ্যবাহী হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা, যেখানে আটঘর, কুড়িয়ানা, ভীমরুলি, গুয়াবাড়িয়া, ইন্দেরহাট এবং পাশর্^বর্তী ভাসমান গ্রামগুলোতে হিন্দুদের বসতি বেশি, বিশেষ করে নদীকেন্দ্রিক জীবনযাপনে হিন্দু সম্প্রদায় প্রভাবশালী। এখানে প্রচুর প্রাচীন মন্দির, মঠ ও কীর্তন মন্ডব রয়েছে, যা এই অঞ্চলের

সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নেছারাবাদের অনেক গ্রাম (যেমন : আটঘর, কুড়িয়ানা, ভীমরুলি) এবং তাদের সংলগ্ন এলাকাগুলোতে হিন্দু সম্প্রদায় ঘনীভূতভাবে বসবাস করে, বিশেষত নদী ও খাল-পারের গ্রামগুলোতে। এখানকার জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতিতে হিন্দু ঐতিহ্যের ছাপ স্পষ্ট, যা তাদের ধর্মীয় উৎসব ও সামাজিক রীতিনীতিতে প্রতিফলিত হয়। এই অঞ্চলে অসংখ্য প্রাচীন মন্দির, মঠ, কীর্তন মন্ডপ এবং শ্মশানঘাট রয়েছে, যা তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। এখানকার মন্দির ও মঠগুলো বেশ বিখ্যাত এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের মিলনস্থল। ভীমরুলির খেয়াঘাট ও মন্দিরগুলোও হিন্দু অধ্যুষিত এলাকার পরিচিতি বহন করে। খালের ওপর কাঠের নড়বড়ে সেতু পাড় হয়ে সামনেই নতুন পিচঢালা পথ। এ পথ চলে গেছে খালের মোহনা সন্ধ্যা কিংবা বেলুয়া নদী পর্যন্ত। যেহেতু এখন আমড়া পেয়ারার গড় মৌসুম সেহেতু পথেঘাটে লোকজন তেমন নেই বললেই চলে। যে কয়েকজন নারী-পুরুষের সঙ্গে দেখা হয়েছে তাদের অনেকেরই গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, কপালে তিলক ও মহিলাদের হাতে সাদা শঙ্খের চুড়ি দেখেছি। সবকিছু দেখে মনে পড়ে গেল, শৈশবে দিদিমার কাছে শোনা কল্পজগতের লমলমা সাগরের কিনারায় চলে এসেছি আমি। এখানে রাক্ষস-খোক্কসের কোনো ভয় নেই, এখানে হিন্দু-মুসলমান শান্তিপূর্ণভাবে বাস করছে প্রাচ্যের ভেনিসে।

লেখক: আইনজীবী ও কথাসাহিত্যিক

adv.zainulabedin@gmail.com

পোস্টটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আরও নিউজ
© All rights reserved © 2025 Barisal Crime Trace
Theme Customized By Engineer BD Network