নিজস্ব প্রতিবেদক : বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার উপকূলীয় বনাঞ্চল ও সমুদ্রসৈকত হরিণঘাটা–লালদিয়া চর ধীরে ধীরে পর্যটকদের নজর কাড়ছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নির্জন পরিবেশ ও সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের কারণে এলাকাটি ইতোমধ্যে পরিচিতি পেলেও যোগাযোগ, অবকাঠামো ও নিরাপত্তার ঘাটতি এখনো বড় সংকট হয়ে আছে।
বঙ্গোপসাগর, বিষখালী ও বলেশ্বর নদের মোহনায় অবস্থিত এই চর এলাকায় সবুজ বন, আঁকাবাঁকা খাল ও বিস্তৃত বালুকাবেলা একসঙ্গে মিশে গেছে। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় এখানকার প্রকৃতি আরও মনোমুগ্ধকর হয়ে ওঠে। পর্যটকদের মতে, কম জনসমাগম থাকায় নিরিবিলি পরিবেশে প্রকৃতিকে কাছ থেকে উপভোগ করার সুযোগ মেলে।
সপরিবারে বরগুনা শহর থেকে বেড়াতে আসা পর্যটক আরিফ হোসেন মোল্লা বলেন, “আমি অনেক জায়গায় ঘুরেছি, কিন্তু হরিণঘাটা–লালদিয়া চরের মতো শান্ত পরিবেশ খুব কম জায়গায় পেয়েছি। মনে হয় প্রকৃতি এখনো অনেকটাই অক্ষত আছে। তবে এখানে আসতে আমাদের বেশ ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।”
ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে আসা পর্যটক নাসরিন আক্তার মৌসুমী বলেন, “বন, নদী আর সমুদ্র—সব এক জায়গায় পাওয়া যায়। শিশুদের নিয়ে এলে প্রকৃতি সম্পর্কে জানার ভালো সুযোগ রয়েছে। তবে রাস্তাঘাট ভালো না হওয়ায় যাত্রাটা কষ্টকর হয়েছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা দরকার।”
এলাকায় কেওড়া, গরাণ, গেওয়া, সুন্দরী ও ঝাউসহ নানা প্রজাতির গাছ রয়েছে। বনাঞ্চলে চিত্রল হরিণ, বানর, বনবিড়াল, গুইসাপসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর বিচরণ দেখা যায়। পাখির কলরব ও সৈকতের লাল কাঁকড়ার উপস্থিতি পর্যটকদের বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করে।
২০১৫ সালে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে জলবায়ু ট্রাস্টের অর্থায়নে এখানে ইকো-ট্যুরিজম প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। এ সময় ফুট ট্রেইল, ওয়াচ টাওয়ার ও বিশ্রামাগার নির্মাণ করা হয়। জোয়ারের সময় খালে নৌভ্রমণও চালু হয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পটির সম্প্রসারণ কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে আছে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা যোগাযোগ ব্যবস্থা। হরিণঘাটা থেকে লালদিয়া পর্যন্ত পায়ে হাঁটার সেতু এখনো সম্পূর্ণ না হওয়ায় পর্যটকদের ছোট নৌকায় ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হতে হয়। বিদ্যুৎ ব্যবস্থা না থাকায় রাতযাপনের সুযোগ সীমিত। পাশাপাশি পর্যাপ্ত প্রশাসনিক নজরদারি না থাকায় কোথাও কোথাও অবৈধভাবে গাছ কাটার অভিযোগও রয়েছে।
বরগুনা জেলা পর্যটন শিল্প উদ্যোক্তা কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট সোহেল হাফিজ বলেন, “হরিণঘাটা–লালদিয়া চর একটি অপার সম্ভাবনাময় পর্যটন এলাকা। পরিকল্পিত উন্নয়ন হলে এটি দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম ইকো-ট্যুরিজম গন্তব্যে পরিণত হতে পারে। কিন্তু যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও নিরাপত্তার অভাবে উদ্যোক্তারা এগোতে পারছেন না।
তিনি আরও বলেন, “লালদিয়া সেতু দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। স্থানীয় মানুষকে সম্পৃক্ত করলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং বন সংরক্ষণও সহজ হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান, বেলাল হোসেন, জাকিয়া সুলতানা, শিরীন আক্তার ও মোতালেব হোসেনসহ আরও অনেকে পর্যটন বিকাশের পক্ষে মত দেন। তাঁদের ভাষ্য, পর্যটন বাড়লে উপকূলের মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে, তবে বন ও পরিবেশ রক্ষায় কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা, সমন্বিত উদ্যোগ ও কঠোর সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে হরিণঘাটা–লালদিয়া চর শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের স্থান নয়, বরং টেকসই উন্নয়নের একটি সফল উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে। পর্যটনের হাত ধরেই উপকূলের মানুষের নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যেতে পারে।