1. diggilseba@gmail.com : admin :
  2. ashadul@barisalcrimetrace.com : Ashadul Islam : আসাদুল ইসলাম
  3. hafiz@barisalcrimetrace.com : barisal CrimeTrace : barisal CrimeTrace
  4. mahadi@barisalcrimetrace.com : মাহাদী হাসান : মাহাদী হাসান
ইতিহাসের নীরব সাক্ষী: বরিশাল বিভাগীয় জাদুঘর - বরিশাল ক্রাইম ট্রেস
বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬, ০২:৫৫ পূর্বাহ্ন

ইতিহাসের নীরব সাক্ষী: বরিশাল বিভাগীয় জাদুঘর

  • আপডেট সময় : বুধবার, ২৪ জুন, ২০২৬

ডেস্ক সংবাদ : বরিশাল নগরের ব্যস্ততার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি ভবন। ইট-সুরকির সেই স্থাপনাটি শুধু একটি সরকারি ভবন নয়—এটি প্রায় দুই শতাব্দীর ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের প্রশাসনিক কেন্দ্র থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক, সময়ের দীর্ঘ পথচলার নীরব সাক্ষী বরিশাল বিভাগীয় জাদুঘর।

কিন্তু যে জাদুঘরের দায়িত্ব ছিল বরিশালের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও গৌরবময় অতীতকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা, আজ সেই জাদুঘরই যেন অবহেলা আর অযত্নের নির্মম বাস্তবতায় হারিয়ে ফেলছে নিজের অস্তিত্বের ঔজ্জ্বল্য। বয়সের ভারে ক্লান্ত ভবনের দেয়ালে ফাটল, অপরিকল্পিত পরিবেশ, সীমিত সংগ্রহ, হকারদের দখল আর পরিচ্ছন্নতার অভাব, সব মিলিয়ে বরিশালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানটি যেন নিজেই সংরক্ষণের আবেদন জানাচ্ছে।

১৮২১ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে নির্মিত পুরোনো কালেক্টরেট ভবনটি বরিশালের প্রাচীনতম সরকারি স্থাপনাগুলোর একটি। প্রায় দেড়শ বছর জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম পরিচালনার পর ভবনটি সংরক্ষণ করে বিভাগীয় জাদুঘরে রূপান্তর করা হয়।

শুধু প্রশাসনিক ইতিহাস নয়, এই ভবনের প্রতিটি দেয়াল বহন করে ব্রিটিশ শাসন, পাকিস্তান আমল, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের নানা সময়ের স্মৃতি। ফলে ভবনটি নিজেই একটি মূল্যবান ঐতিহাসিক নিদর্শন।

জাদুঘরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে সময়ের ক্ষতচিহ্ন। ভবনের বিভিন্ন দেয়ালে ফাটল, কোথাও কোথাও পলেস্তারা খসে পড়েছে। কাঠের দরজা-জানালার অনেক অংশে বয়সের ছাপ স্পষ্ট। দীর্ঘদিনের ব্যবহারে ভবনের বিভিন্ন অংশ নড়বড়ে হয়ে পড়লেও প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ ও সংস্কারের দৃশ্যমান উদ্যোগ খুব একটা চোখে পড়ে না।

জাদুঘরের সামনের চিত্রও হতাশাজনক। পুরো ফুটপাতজুড়ে হকারদের দোকান। এতে ঐতিহাসিক ভবনটির সৌন্দর্য যেমন আড়াল হয়ে যায়, তেমনি দর্শনার্থীদের চলাচলেও সৃষ্টি হয় ভোগান্তি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু অসচেতন ব্যক্তি জাদুঘরের বাইরের দেয়ালকে প্রস্রাবখানা হিসেবে ব্যবহার করেন। ফলে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে এবং দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ নষ্ট হয়। এমন দৃশ্য শুধু জাদুঘরের সৌন্দর্যই নষ্ট করছে না, বরং নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকেও সামনে এনে দিচ্ছে।

দর্শনার্থীদের অনেকেই মনে করেন, জাদুঘরের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা এর প্রদর্শনীতে।

এখানে সংরক্ষিত কিছু প্রত্নবস্তু নিঃসন্দেহে মূল্যবান। কিন্তু সেগুলোর অনেকগুলোর সঙ্গে বরিশালের সরাসরি ঐতিহাসিক বা সাংস্কৃতিক সম্পর্ক নেই। অথচ বরিশালের নিজস্ব ইতিহাস, নদীকেন্দ্রিক জীবন, নৌ-সংস্কৃতি, কৃষি, লোকজ ঐতিহ্য, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, কীর্তিপাশা জমিদার বাড়ি, শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক, কবি জীবনানন্দ দাশ, অশ্বিনী কুমার দত্ত, চারণকবি মুকুন্দ দাসসহ দক্ষিণাঞ্চলের ইতিহাসের অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরা সম্ভব।

ইতিহাসবিদদের মতে, একটি আঞ্চলিক জাদুঘরের সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়া উচিত সেই অঞ্চলের নিজস্ব পরিচয়কে তুলে ধরা। কিন্তু সেই জায়গাতেই বরিশাল বিভাগীয় জাদুঘরের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি।

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সাবেক অধ্যক্ষ স. ম. ইমানুল হাকিম বলেন, বরিশাল বিভাগীয় জাদুঘরকে শুধুমাত্র একটি ভবন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ধারক। কিন্তু দুঃখজনকভাবে প্রতিষ্ঠানটি এখনো তার প্রাপ্য গুরুত্ব পায়নি। বরিশালের নিজস্ব ইতিহাস, লোকজ সংস্কৃতি ও নদীকেন্দ্রিক জীবনধারা আরও সমৃদ্ধভাবে তুলে ধরতে হবে।

তার মতে, জাদুঘরকে কেন্দ্র করে গবেষণা, প্রকাশনা এবং শিক্ষামূলক কার্যক্রম বাড়ানো গেলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ইতিহাসচর্চার আগ্রহও বৃদ্ধি পাবে।

জাদুঘরের সহকারী কাস্টোডিয়ান আরিফুর রহমান জানান, প্রায় দুইশ বছরের পুরোনো এই ভবনের বিভিন্ন অংশে বয়সের প্রভাব স্পষ্ট।

তিনি বলেন, নিয়মিত সংরক্ষণ ও সংস্কার ছাড়া ভবনটিকে দীর্ঘদিন নিরাপদ রাখা কঠিন হবে। বড় ধরনের কোনো ভূমিকম্প হলে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। আমরা চাই আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা, উন্নত অবকাঠামো এবং পর্যাপ্ত জনবল নিশ্চিত করা হোক।

তিনি আরও জানান, বর্তমানে বরিশাল বিভাগীয় জাদুঘর খুলনা অঞ্চলের অধীনে পরিচালিত হলেও বরিশালে পৃথক আঞ্চলিক কার্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।

ইতিহাসবিদ ও গবেষক অধ্যাপক দেবাশীষ চক্রবর্তী বলেন, একটি জাদুঘর কেবল পুরোনো বস্তু প্রদর্শনের স্থান নয়; এটি একটি অঞ্চলের স্মৃতি, চেতনা এবং পরিচয়ের কেন্দ্র। নতুন প্রজন্মকে নিজেদের ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার অন্যতম মাধ্যম হলো জাদুঘর।

তার মতে, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রদর্শনী, ডিজিটাল আর্কাইভ এবং গবেষণাভিত্তিক উপস্থাপনা যুক্ত করা গেলে জাদুঘরটি নতুন প্রজন্মের কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বরিশাল বিভাগীয় জাদুঘরকে ঘিরে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। ভবনের জরুরি সংস্কার, হকারমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা, নিরাপত্তা জোরদার করা, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং বরিশালকেন্দ্রিক আরও ঐতিহাসিক নিদর্শন সংগ্রহের উদ্যোগ নিতে হবে।

একই সঙ্গে নদীমাতৃক বরিশালের ইতিহাস, লোকসংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধ, সাহিত্য-ঐতিহ্য এবং কৃতী ব্যক্তিত্বদের নিয়ে স্থায়ী গ্যালারি নির্মাণ করা গেলে জাদুঘরটি দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

প্রায় দুইশ বছর ধরে বরিশালের উত্থান-পতন, সংগ্রাম, স্বপ্ন ও পরিবর্তনের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই ভবন। তার দেয়ালে জমে আছে সময়ের ধুলো, কিন্তু হারিয়ে যায়নি ইতিহাসের আবেদন।

আজ প্রশ্ন একটাই, যে জাদুঘর আমাদের অতীতকে ভবিষ্যতের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করছে, সেই জাদুঘরের ভবিষ্যৎ রক্ষায় আমরা কতটা দায়িত্বশীল?

কারণ ইতিহাস কখনও নিজেকে রক্ষা করতে পারে না। ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখতে হয় মানুষের সচেতনতা, ভালোবাসা এবং দায়িত্ববোধ দিয়েই।

পোস্টটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আরও নিউজ
© All rights reserved © 2025 Barisal Crime Trace
Theme Customized By Engineer BD Network