নিজস্ব প্রতিবেদক : বর্ষা এলেই আতঙ্ক নেমে আসে পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার গোলখালী ইউনিয়নের দক্ষিণ-পূর্ব গোলখালী গ্রামের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে। চলাচলের একমাত্র সড়কটি বর্ষার পানিতে তলিয়ে গিয়ে পরিণত হয় কাদা-পানি আর খানাখন্দে। বাধ্য হয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাতায়াত করতে হয় ছোট ডিঙি নৌকায়। এতে একদিকে যেমন রয়েছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি, অন্যদিকে নৌকার ভাড়া গুনতে গিয়ে বাড়তি আর্থিক চাপ পড়ছে দরিদ্র পরিবারগুলোর ওপর।
গোলখালী ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে সাবেদ হোসেন তালুকদারের বাড়ির সংলগ্ন এলাকায় পাশাপাশি অবস্থিত দক্ষিণ-পূর্ব গোলখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দক্ষিণ-পূর্ব গোলখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়। দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী রয়েছে প্রায় ৬০০। আশপাশের চারটি গ্রামের শিক্ষার্থীরা এসব প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে।
স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘ কয়েক যুগ ধরে বিদ্যালয় দুটির যোগাযোগব্যবস্থা নাজুক। বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। দক্ষিণ-পূর্ব গোলখালী গ্রামের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষার্থীকে প্রতিদিন বিদ্যালয়ে আসতে হয়। তাদের যাতায়াতের প্রধান সড়কটি বর্ষায় সম্পূর্ণ চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সড়কের বিভিন্ন অংশে বড় বড় গর্ত। কোথাও বিলের সমতল জমির সঙ্গে রাস্তা মিশে গেছে, কোথাও তৈরি হয়েছে ডোবা-নালা। আবার কোনো কোনো অংশে হাঁটুসমান কাদা ও পানি জমে আছে। ফলে পায়ে হেঁটে কিংবা কোনো যানবাহনে ওই পথ দিয়ে বিদ্যালয়ে যাতায়াত প্রায় অসম্ভব।
এ অবস্থায় প্রতি বছর সন্তানদের স্কুলে যাতায়াতের কথা চিন্তা করে স্থানীয় অভিভাবকদের উদ্যোগে একটি ছোট ডিঙি নৌকা তৈরি করা হয়। শিক্ষার্থীদের পারাপারের জন্য রাখা হয় একজন মাঝিও। প্রতিদিন নৌকায় করে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত করানো হয়। এর জন্য প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে দিতে হয় প্রায় ২০ টাকা করে।
দরিদ্র পরিবারের অনেক অভিভাবকের জন্য এই অতিরিক্ত খরচ বহন করাও কঠিন হয়ে পড়ে। আবার মাঝি অসুস্থ থাকলে কিংবা নৌকার ভাড়া দেওয়ার মতো টাকা না থাকলে সেদিন অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। কখনো কখনো বড় শ্রেণির শিক্ষার্থীরাই ঝুঁকি নিয়ে নৌকা চালিয়ে বিদ্যালয়ে যায় বলে জানান স্থানীয়রা।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব নৌকায় বিদ্যালয়ে যাতায়াতকারী অনেক কোমলমতি শিক্ষার্থীই সাঁতার জানে না। অথচ তাদের জন্য নেই কোনো লাইফ জ্যাকেট বা প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম। ফলে ছোট একটি নৌকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। যে কোনো সময় ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা- এমন আশঙ্কায় থাকেন অভিভাবকরা।
শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আশঙ্কা, বছরের পর বছর এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে বিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার বাড়তে পারে। একই সঙ্গে নৌকায় ছোট একটি নৌযানে একাধিক শিক্ষার্থীর নিয়মিত যাতায়াত নিয়েও রয়েছে দুর্ঘটনার শঙ্কা।
স্থানীয় অভিভাবক সুমন প্যাদা বলেন, এ আধুনিক যুগে সন্তানদের নৌকায় করে স্কুলে পাঠাতে হয়- এটা ভাবতেই অবাক লাগে। সন্তানকে নৌকায় তুলে দেওয়ার পর সে নিরাপদে স্কুলে পৌঁছেছে কি না, আবার বাড়িতে ফিরেছে কি না- এ নিয়ে সারাক্ষণ চিন্তায় থাকি। আমরা এ দুর্ভোগ থেকে মুক্তি চাই।
দক্ষিণ-পূর্ব গোলখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী আরিয়ান হোসেন, ইব্রাহিম, জসিম উদ্দিন ও আদিন হোসেন বলেন, বর্ষার সময় নৌকায় স্কুলে যেতে খুব কষ্ট হয়। নৌকাটি ছোট। প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করতে হয়। আমরা একটি ভালো রাস্তা চাই।
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী সুমনা আক্তারও একই ধরনের দুর্ভোগের কথা জানিয়ে দ্রুত রাস্তা সংস্কারের দাবি জানায়।
দক্ষিণ-পূর্ব গোলখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল জলিল মিয়া বলেন, বিদ্যালয়ের যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার লিখিতভাবে আবেদন করেছি। কিন্তু এখনো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সরকারের কাছে আমাদের জোর দাবি, শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে দ্রুত রাস্তাটি চলাচলের উপযোগী করা হোক।
শুধু দক্ষিণ-পূর্ব গোলখালী গ্রামের শিক্ষার্থীরাই নয়, উত্তর-পূর্ব গোলখালী ও পূর্ব গোলখালী গ্রামের শিক্ষার্থীরাও একই ধরনের দুর্ভোগের শিকার। উত্তর-পূর্ব গোলখালী গ্রামটি বিদ্যালয় থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে। ওই এলাকার যোগাযোগের প্রধান মাধ্যমও একটি কাঁচা রাস্তা। বর্ষায় সেটিও চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। অন্যদিকে পূর্ব গোলখালী গ্রামটি বিদ্যালয় থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে। সেখানকার শিক্ষার্থীদেরও কাঁচা রাস্তা দিয়ে বিদ্যালয়ে আসতে হয়।
ফলে বর্ষা মৌসুমে বিদ্যালয় দুটির প্রায় ৬০০ শিক্ষার্থীকে নানা ধরনের দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে স্কুলে আসা-যাওয়া করতে হচ্ছে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ, বছরের পর বছর এ সমস্যা থাকলেও স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।
দক্ষিণ পূর্ব গোলখালি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি মো. সোহেল রানা বলেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক। বর্ষা এলেই নৌকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে যাওয়া যেন তাদের নিয়তি না হয়।
গলাচিপা উপজেলা প্রকৌশলী মো. হাবিবুর রহমান বলেন, আমি এ উপজেলায় নতুন যোগদান করেছি। সরেজমিনে গিয়ে বিষয়টি পরিদর্শন করব। এরপর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় স্কিম আকারে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।
গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবুজর মো. ইজাজুল হক বলেন, আমি সরেজমিনে গিয়ে বিষয়টি পরিদর্শন করব। বাস্তব অবস্থা দেখে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাব এবং সমস্যাটির সমাধানে সর্বাত্মক চেষ্টা করব।