নিজস্ব প্রতিবেদক : চুক্তির মেয়াদ শেষ, যান্ত্রিক ত্রুটি এবং বকেয়া গ্যাস বিল পরিশোধের জটিলতায় বন্ধ থাকা ভোলার খেয়াঘাট এলাকার ৩৪ দশমিক ৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি ফের সচল হচ্ছে। গ্যাসের মূল্য পরিশোধ করে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছেন।
বেসরকারি বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘ভেনচার এনার্জি রিসোর্সেস লিমিডটেড’ কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত জেলা সদর ভোলার এ রেন্টাল পাওয়ার কেন্দ্রটি ২০০৯ সালের জুলাই মাসে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু করে। শুরুতেই এর উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ৩৪ দশমিক ৫ মেগাওয়াট, যা পরে ৪০ মেগাওয়াটে উন্নীত করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি ভোলা জেলার চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছিল।
তবে ২০২৪ সালে কেন্দ্রের প্রধান গ্যাস টারবাইন বিকল হয়ে যায়। এরপর ব্যাকআপ ইউনিটের মাধ্যমে সীমিত আকারে বিদ্যুৎ উৎপাদন অব্যাহত থাকলেও ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ওজোপাডিকো) সাথে করা চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় এবং বকেয়া গ্যাস বিল পরিশোধ না করায় সেটিও বন্ধ হয়ে যায়।
এর ফলে জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহে জটিলতা বেড়েছে। ঘন ঘন লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটে জেলার বেশ কিছু এলাকায় ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থীরা। তবে এমন সমস্যা খুব দ্রুতই নিরসনে কোম্পানিটি কাজ করছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছেন।
ভেনচার এনার্জি রিসোর্সেস কোম্পানির প্রকৌশলী মো. জাকির হোসেন সবুজ জানান, আমাদের কোম্পানির সাথে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির চুক্তির মাধ্যমেই আমরা পাওয়ার প্লান্ট চালাতাম। আমাদেরকে গ্যাস সরবরাহ করতে তাদের সাথে পেট্রোবাংলার সহযোগী প্রতিষ্ঠান সুন্দরবন গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির চুক্তি রয়েছে।
প্রথমত: ওই চুক্তির মেয়াদ শেষ; দ্বিতীয়ত: ভেনচার এনার্জি রিসোর্সেস কোম্পানির কাছ থেকে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ২০ কোটি টাকা বকেয়া পাওনা রয়েছে। ফলে এমন জটিলতায় পড়ে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি ২০২৫ সালের জুন মাস থেকেই বন্ধ হয়ে আছে। একই সঙ্গে সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির কাছে প্রায় ২০ কোটি টাকার গ্যাস বিল না পেয়ে তারা ওই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ফলে বর্তমানে জেলা সদর ভোলার সাড়ে ৩৪ মেগাওয়াট প্লানটি’র বিদ্যুৎ উৎপাদন কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে আছে।
ভোলার স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বন্ধ হওয়ার পর জেলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার আড়াইশ’ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করে ভোলা শহরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হচ্ছে। ঝড়-বৃষ্টি কিম্বা বৈরী আবহাওয়ায় ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিচ্ছে। এছাড়া জেলার একটি সাব-স্টেশন অচল থাকায় চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহও ব্যাহত হচ্ছে। তাই ওই সাব স্টেশনটিও সচল করার দাবি উঠেছে।
৩৪ দশমিক ৫ মেগাওয়াট ভোলা পাওয়ার প্লান্টের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মো. হাফিজুর রহমান বলেন, আমাদের এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি চালুর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। ভেনচার এনার্জি রিসোর্সেস কোম্পানি কর্তৃক সরকারের পাওনা বিল পরিশোধের চেষ্টা চলছে। প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত ও গ্যাস সংযোগ পুনর্বহাল হলেই কেন্দ্রটি পুনরায় চালুর সুযোগ রয়েছে।
ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন (ওজোপাডিকো) ভোলা অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইউসুফ বলেন, বকেয়া বিলের দায়ে কেন্দ্রটি বন্ধ থাকায় জেলায় আপাতত বিকল্প উৎস্য থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে দূরবর্তী এলাকা থেকে বিদ্যুৎ আনায় সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছুটা চাপ তৈরি হচ্ছে। যা শীঘ্রই সমাধানের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলেও জানান ভোলা বিদ্যুৎ বিভাগের এ শীর্ষ কর্তা।
এ বিষয়ে ভোলা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, ভোলার বিদ্যুৎ জেলার প্রতিটি নাগরিকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
তিনি বলেন, ভোলার গ্যাসকে কাজে লাগিয়ে জেলায় আরো কয়েকশত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণে সরকারের মহাপরিকল্পনা রয়েছে।
ভোলার জেলা পরিষদ প্রশাসক আলহাজ্ব গোলাম নবী আলমগীর গণমাধ্যমকে জানান, জেলায় প্রাপ্ত গ্যাস সম্পদকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি ও ভোলাকে উপকূলীয় শিল্পাঞ্চল হিসেবে গড়ে তুলতে বর্তমান সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
এদিকে স্থানীয়রা বলছেন বিষয়টি নিয়ে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা না হলে ভোলার বিদ্যুৎ সংকট আরও প্রকট হবে এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে। তাই নতুন সরকারের দক্ষ হস্তক্ষেপে গ্যাস সমৃদ্ধ ভোলায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাবার প্রত্যাশা করছেন জেলাবাসী।