‘বিচার যদি না পাই আমি আর দুনিয়ায় থাকুম না’

Barisal Crime Trace
প্রকাশিত এপ্রিল ২৭ মঙ্গলবার, ২০২১, ০৮:৫০ অপরাহ্ণ
‘বিচার যদি না পাই আমি আর দুনিয়ায় থাকুম না’

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ মাদারীপুরে পরকীয়ার অভিযোগ তুলে সালিস বসিয়ে ধর্মীয় সম্পর্কের ভাইবোনকে ১০০ জুতাপেটা করেছে প্রভাবশালী একটি মহল। পরে তাদের জুতার মালা পরিয়ে এলাকা ঘুরিয়ে সমাজচ্যুত করা হয়। একই সঙ্গে তাদের ঘরে তালা ঝুলিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়।

 

গতকাল সোমবার রাজৈর উপজেলার বাজিতপুর ইউনিয়নের সুতারকান্দি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। মাতব্বরদের ভয়ে বিষয়টি প্রথমে গোপন রাখা হলেও আজ মঙ্গলবার লোকমুখে বিষয়টি জানাজানি হয়। পরে এ ঘটনায় মামলা হলে রাজৈর থানা পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে জেল হাজতে পাঠিয়েছে।

 

স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, মাদারীপুর সদর উপজেলার পেয়ারপুর গ্রামের মনির মিয়ার (৪০) সঙ্গে রাজৈর উপজেলার গৃহবধূর ধর্মীয়ভাবে আত্মীয়তা রয়েছে। তারা ধর্ম ভাইবোন হিসেবে উভয়ের বাড়িতে যাতায়ত করেন।

 

আত্মীয়তা সূত্র ধরে গতকাল সোমবার সকাল ৯টার দিকে মনির মিয়া তার সেই বোনের বাড়িতে বেড়াতে আসেন। কিছুক্ষণ পরেই একই বাড়ির কালু ফকির, ইমরান ফকির, শাকিব আকন, রানা ফকির, শামীম ফকিরসহ ৮-১০ জন মনির ও তার বোনকে ঘর থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে বাইরে আনেন।

 

পরে মনির ও তার ধর্ম বোনকে বেঁধে ফেলেন। একপর্যায় বাড়ির উঠানে সালিস বসায়। সালিসে কালু ফকির গং কারও বক্তব্য না শুনে তাদের ইচ্ছামতো রায় ঘোষণা করেন।

 

রায় অনুযায়ী, ওই গৃহবধূ ও মনিরকে ১০০ জুতাপেটা, জুতার মালা পরিয়ে সারা এলাকা ঘুরানো এবং তাদের ঘরে তালা ঝুলিয়ে এলাকা থেকে বের করার রায় ও সমাজচ্যুত করা হয়।

 

পরে ইমরান ফকির, কালু ফকির আজিজুলসহ ৮-১০ জন শত শত মানুষের সামনে ওই দুজনকে ১০০ জুতা পেটা করেন। এরপর জুতার মালা পরিয়ে পুরো এলাকা ঘোরায়।

 

শুধু তাই নয়, ওই গৃহবধূর ঘরে তালা ঝুলিয়ে এলাকা থেকে বের করে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় উৎসুক জনতা শুধু দেখেছে। কিন্তু প্রভাবশালীদের ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস পায়নি।

 

এ ঘটনার পর সালিসের প্রধান কালু ফকির, ইমরান ফকির, শামীম ফকিরসহ সাতজনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত ৮-১০ জনের নামে রাজৈর থানায় একটি মামলা দায়ের করেছে ভুক্তভোগীর স্বামী।

 

 

পুলিশ এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে সালিসের প্রধান কালু ফকির, আজিজুল ফকির ও শাকিব আকনকে গ্রেপ্তার করে মাদারীপুর জেল হাজতে পাঠিয়েছে।

 

ভুক্তভোগী গৃহবধূ বলেন, ‘ওরা আমাকে ও আমার ভাইকে জোর করে বাইন্দা গ্রামের সবার সামনে ১০০ জুতার বাড়ি দিছে, জুতার মালা পরাই সারা গ্রাম ঘুরাইছে। আবার মোর ঘরে তালা দিছে।

 

এহন আমরা ওগো ভয়তে গ্রামছাড়া। ওদের ডরে নিজের ঘরে যাইতে পারি নাই। এহন হুনছি ওরা নাকি আমাগো সমাজেরতোন বাইর কনর্যা দিবে। এই অপমানের পর আরকি বাইচ্যা থাকতে ইচ্ছা করে।

 

গেছিলাম মরতে তয় মেম্বার কইছে, আমার অপমানের বিচার কইরা দিবো, হেই কারণে মরি নাই। যদি বিচার না পাই তাইলে আমি আর দুনিয়ায় থাকুম না।’

এলাকার মেম্বর তারা মিয়া বেপারী বলেন, ‘ধর্মের ভাইবোনকে কথিত বিচারের নামে একটি প্রহসনের সালিস বসায়। সালিসে এলাকার মেম্বর হিসেবে আমার কোনো কথাই তারা শোনেনি।

 

এমনকি ভুক্তভোগী ওই নারীর কোনো কথা না শুনে কালু ফকির, ইমরান ফকির, শামীম ফকির, রানা ফকির গং নিজেদের ইচ্ছামতো রায় ঘোষণা করে।’

 

তারা মিয়া বেপারী আরও বলেন, ‘কথিত বিচারে ওই নারী ও তার ধর্ম ভাই মনিরকে ১০০ জুতা পেটা ও জুতার মালা পরিয়ে সারা এলাকায় ঘুরানোর রায় দেওয়া হয়।

 

সাথে সাথে কালু, ইমরান, রানা গংরা তাদের বেঁধে উভয়কে ১০০ করে জুতা পেটা করে। এ সময় ওই নারীর আত্মচিৎকার ও আর্তনাদে এলাকার বৃদ্ধ-বণিতার চোখে পানি আসলেও কথিত সমাজপতি মাতব্বরদের মন গলেনি। একপর্যায় সমাজপতিরা তাদের জুতার মালা বানিয়ে তাদের গলায় পরিয়ে পুরো এলাকায় ঘুরায়।’

 

বাজিতপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম হাওলাদার বলেন, ‘জঘন্যতম কাজটি যারা করেছে, যারা আইনকে নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে। তাদের এবং এর পেছনে ইন্ধনদাতাদেরও বিচার হওয়া উচিত।’

 

ভুক্তভোগী গৃহবধূর স্বামী বলেন, ‘আমি আইজ দীর্ঘ ৩৬ বছর ধরে আমার স্ত্রী খোদেজা বেগমকে নিয়ে ঘর-সংসার করে আসছি। তার চরিত্র খারাপ হলে আমিই আগে জানতাম। যদি আমার স্ত্রী কোনো অপরাধ করে থাকে তাহলে বিচার করতাম।

 

উনারা কেন আমার স্ত্রী ও আমার আত্মীয়কে জুতাপেটা করে জুতার মালা পরিয়ে এলকা ঘুরাল? এখন তারা বিচারের নামে আমাগো ঘরে তালা দিয়ে বের করে দিল।

 

আমি ও আমার স্ত্রী ঘরে যেতে পারছি না। আমাগো সমাজচ্যুত করার হুমকি দিচ্ছে ভয়ে আমরা কিছুই করতে পারছি না। আমার ছেলেমেয়ে আছে, তাদের বিয়ে দিয়েছি, নাতি-নাতনি রয়েছে। আমারা কিভাবে মানুষরে মুখ দেখাব। আমি এর বিচার চাই।’

 

সালিসের প্রধান হোতা কালু ফকির গ্রেপ্তারের পর বলেন, ‘ওই মহিলা খুবই বাজে চরিত্রের লোক। তাই একটু শাসনের জন্য সালিস করা হয়। সালিসে অনেক মাতব্বর ছিল। তারা সবাই মিলে এ রায় দেয়।’

 

এ বিষয়ে রাজৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ সাদী বলেন, ‘ঘটনা শোনার সাথে সাথে আমরা থানায় মামলা নিয়েছি। রাতে অভিযান চালিয়ে এ ঘটনার মূল হোতা কালু ফকিরসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।

 

বর্বরোচিত এ ঘটনার সাথে জড়িত প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা হবে। কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। বাকি আসামিদের ধরার ব্যাপারে জোর তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।’




আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি বরিশাল ক্রাইম ট্রেস”কে জানাতে।
ই-মেইল করুনঃ[email protected]