ইফতেখার শাহীন, বরগুনা। গোলগাছের পাতা নারিকেল পাতার মতো দেখতে এবং এটি সাধারণত নোনা পানিসহ উপকূলীয় এলাকায় জন্মায়। সবুজ বর্ণের পাতা। এই গাছের ছড়ি কাটা হলে মিষ্টি রস বের হয়, যা স্থানীয়ভাবে গোলের রস নামে পরিচিত।
বরগুনা জেলার তালতলী উপজেলার বেহালা ও নিশানবাড়িয়া এলাকায়, শীত মৌসূমে এই গোল গাছের রস দিয়েই তৈরি হয় খাঁটি ও সু-স্বাদু গোলের গুড়। এই গাছ থেকে সংগ্রহ করা সুমিষ্ট রস আগুনে জ্বাল দিয়ে তৈরী করা হয় গোলের গুড়। গ্রামাঞ্চলে এই গোল গাছের পাতা দিয়ে হতো ঘরের ছাউনি। যেমনিভাবে নানা কাজে গোলপাতার ব্যবহার জনজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আঁসছে, ঠিক তেমনি গোল গাছের রস থেকে তৈরি গুড়ও ধরে রেখেছে তার পুরোনো ঐতিহ্য।
গোল গাছের যে ছড়ি বের হয় সেটির মাথা ধারালো দা দিয়ে কাঁটা হয়, আর কাঁটা অংশ থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় নিসৃত রস প্লাস্টিক বা মাটির কলসে গাছিরা খুব সকালে সংগ্রহ করে ছেঁকে ডোঁঙায় করে আগুনের জ্বালে এই সুমিষ্ট গুঁড় তৈরী করেন। সাধারণত শীত মৌসূমে গোলের রস আহরণ করা হয়।
বর্তমানে গোল পাতার ব্যবহার কমে আসলেও গোলের গুড়ের চাহিদার যেনো কমতি নেই। স্থানীয় বাজারে গোলের রস সাধারণত প্রতি কলস ১০০-১৫০, গুড়ের দর কেজি প্রতি ২০০ টাকায় বিক্রি হয়।
বেহালা গ্রামের গাছি পংকজ কির্তনীয়া বলেন, বেহালা গ্রামটিতে ১৪৭ টি পরিবারের গোলের বাগান আছে। প্রত্যেক পরিবারেই প্রায় ৫০ টি করে ছড়া আছে। এই গোলের রস এবং গুড় দিয়েই আমরা জীবীকা নির্বাহ করে থাকি। তাই, কৃষি বিভাগ থেকে যদি আমরা বিভিন্ন রকমের সাহায্য সহযোগিতা পেতাম তাহলে এই রস এবং গুড় বেশী করে উৎপাদন করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দিতে পারতাম। এই গুড়ের চাহিদা অনেক বেশী তাই, চাহিদা অনুযায়ী সেভাবে গুড় উৎপাদন করতে পারছিনা।
গোলের রস থেকে গুড় উৎপাদনে গাছিদের প্রশিক্ষণ ও উন্নত প্রযুক্তি না থাকায় এখন পর্যন্ত আধুনিক পদ্ধতিতে বাজারজাতকরন হয়নি। গাছিদের দাবী, সরকারি সহায়তা এবং প্রশিক্ষণ পেলে এই পণ্য দেশের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানী হতে পারে।
এ ব্যাপারে তালতলী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা সাইফুল আলম বলেন, বেহালা এবং নিশানবাড়িয়া এলাকায় ২৬ হাজার ২’শ ৫০ টি গোলের গাছ রয়েছে। এ থেকে ৫৫ মেট্রিক টন রস এবং ১৩ মেট্রিক টন গুড় তৈরী হয়। এ মৌসূমে ৩৫ হেক্টর জমিতে গোলের গাছ থেকে রস সংগ্রহ করা হচ্ছে। গোলের গুড় অত্যন্ত সুস্বাদু এবং দেশে এর ব্যাপক চাহিদাও রয়েছে। কৃষি অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে গোল চাষীদের সর্বাত্মক পরামর্শ দেয়াসহ বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করা হয়। এই গুড় উৎপাদন করে যদি প্যাকেটজাত ও মানসম্মত হয়, তাহলে তালতলীর গোলের গুড় হতে পারে দেশের অর্থনীতির এক রোল মডেল।