ইসলাম ডেস্ক : মানুষ যখন বিশাল আকাশের দিকে তাকায়, অসীম সমুদ্রের গর্জন শোনে, সূর্য-চন্দ্রের নিয়মিত গতি দেখে কিংবা নিজের শরীরের জটিল গঠন নিয়ে চিন্তা করে, তখন একটি সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে এই বিশ্বজগত কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং একজন সর্বশক্তিমান স্রষ্টার অসীম ক্ষমতার নিদর্শন। ইসলাম ধর্মে সেই সর্বশক্তিমান স্রষ্টা হলেন মহান আল্লাহ তাআলা। পবিত্র কুরআন বারবার মানুষকে আল্লাহর কুদরত, হিকমত এবং অসীম শক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। আল্লাহর ক্ষমতা সীমাহীন, অনন্ত এবং তুলনাহীন। তিনি যা ইচ্ছা করেন, তা-ই হয়ে যায়। তাঁর আদেশের বাইরে কিছুই ঘটতে পারে না।Books & Literature
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন : তিনি যখন কোনো কিছু করার ইচ্ছা করেন, তখন শুধু বলেন ‘হও’, আর তা হয়ে যায়। (সূরা ইয়াসিন: ৮২)। এই আয়াত আল্লাহর অসীম ক্ষমতার সবচেয়ে বড় পরিচয় বহন করে। মানুষ কোনো কাজ করতে সময়, শ্রম ও উপকরণের প্রয়োজন অনুভব করে, কিন্তু আল্লাহ তাআলা কেবল ইচ্ছা করলেই সৃষ্টি হয়ে যায় অসংখ্য জগৎ, প্রাণী ও মহাবিশ্ব।
আল্লাহর ক্ষমতার সবচেয়ে বড় নিদর্শন হলো এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি। আকাশম-লী, পৃথিবী, গ্রহ-নক্ষত্র, পাহাড়-পর্বত, নদ-নদী, জীবজন্তু সবকিছু এমন নিখুঁতভাবে সৃষ্টি হয়েছে যে সামান্যতম ত্রুটিও খুঁজে পাওয়া যায় না। কুরআনে বলা হয়েছে : তিনি সাত আকাশ সৃষ্টি করেছেন স্তরে স্তরে। তুমি দয়াময় আল্লাহর সৃষ্টিতে কোনো অসামঞ্জস্য দেখতে পাবে না। (সূরা আল-মুলক: ৩)। আজকের আধুনিক বিজ্ঞানও স্বীকার করে যে মহাবিশ্ব একটি সুনির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে। সূর্য নির্দিষ্ট সময়ে উদিত হয়, চাঁদ তার কক্ষপথে ঘোরে, পৃথিবী নিরবচ্ছিন্নভাবে ঘুরছে এ সবই মহান আল্লাহর নির্ধারিত নিয়ম। কোটি কোটি নক্ষত্র ও গ্রহ কখনো সংঘর্ষে লিপ্ত না হয়ে শৃঙ্খলার মধ্যে চলছে। এটি আল্লাহর অসীম কুদরতের স্পষ্ট প্রমাণ।
মানবসৃষ্টির মধ্যেও আল্লাহর অসীম ক্ষমতা প্রকাশিত হয়েছে। মানুষকে তিনি মাটির উপাদান থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে জ্ঞান, বিবেক ও অনুভূতি দান করেছেন। মাতৃগর্ভে একটি ক্ষুদ্র বীর্যবিন্দু ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ মানুষে পরিণত হয়। কুরআনে আল্লাহ বলেন : অতঃপর আমি বীর্যকে জমাট রক্তে পরিণত করেছি, তারপর তা থেকে মাংসপি- সৃষ্টি করেছি, তারপর হাড় সৃষ্টি করেছি এবং হাড়ে মাংস আবৃত করেছি। (সূরা আল-মুমিনুন: ১৪)। মানবদেহের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আল্লাহর নিখুঁত পরিকল্পনার বহিঃপ্রকাশ। মানুষের চোখ, কান, হৃদপি-, মস্তিষ্ক সবকিছু এমনভাবে কাজ করে যা বিজ্ঞানীদেরও বিস্মিত করে। এটি প্রমাণ করে আল্লাহ তাআলা কত মহান পরিকল্পনাকারী এবং সর্বশক্তিমান।
আল্লাহ তাআলার ক্ষমতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হলো জীবন ও মৃত্যুর নিয়ন্ত্রণ। পৃথিবীতে কোনো মানুষ নিজের জন্ম নির্ধারণ করতে পারে না এবং মৃত্যুকেও ঠেকাতে পারে না। জন্ম, মৃত্যু, রিজিক, সম্মান সবকিছু আল্লাহর হাতে। তিনি যাকে ইচ্ছা জীবন দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা মৃত্যু দেন। কুরআনে বলা হয়েছে : আল্লাহ জীবন দেন এবং মৃত্যু দেন। (সূরা আল-বাকারা: ২৫৮)। মানুষ যতই শক্তিশালী হোক না কেন, মৃত্যুর সামনে সে অসহায়। এই সত্য মানুষকে আল্লাহর প্রতি বিনয়ী হতে শেখায়।
প্রকৃতির উপর আল্লাহর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। বৃষ্টি বর্ষণ, ঝড়-তুফান, বজ্রপাত, ভূমিকম্প সবই তাঁর নির্দেশে ঘটে। আল্লাহ আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে মৃত জমিকে জীবিত করেন। আবার কখনো মানুষকে সতর্ক করার জন্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ পাঠান। ইতিহাসে বহু জাতি আল্লাহর অবাধ্যতার কারণে ধ্বংস হয়েছে। আদ, সামুদ, ফিরআউনের জাতি তাদের শক্তি ও অহংকার আল্লাহর শাস্তির সামনে টিকতে পারেনি।
হযরত ইবরাহিম (আ.)-কে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়েছিল, কিন্তু আল্লাহর হুকুমে আগুন শীতল হয়ে যায়। হযরত মূসা (আ.)-এর জন্য সমুদ্র দ্বিখ-িত হয়েছিল। হযরত ঈসা (আ.) মৃতকে জীবিত করেছিলেন আল্লাহর অনুমতিতে। এসব অলৌকিক ঘটনা প্রমাণ করে যে আল্লাহ প্রকৃতির নিয়মেরও মালিক। তিনি চাইলে অসম্ভবকে সম্ভব করে দেন। কুরআনে আসহাবে কাহাফের ঘটনাও আল্লাহর অসীম ক্ষমতার এক অনন্য নিদর্শন। কয়েকজন যুবককে আল্লাহ গুহার মধ্যে শত শত বছর ঘুম পাড়িয়ে রাখেন এবং পরে পুনরায় জাগিয়ে তোলেন। এটি মানুষের কাছে অসম্ভব মনে হলেও আল্লাহর জন্য অত্যন্ত সহজ।Books & Literature
আল্লাহর ক্ষমতার সবচেয়ে বড় প্রকাশ ঘটবে কিয়ামতের দিন। সেদিন তিনি সমগ্র বিশ্বজগত ধ্বংস করবেন এবং পুনরায় সব মানুষকে জীবিত করবেন। যারা পৃথিবীতে অন্যায় করেছে, তারা বিচার থেকে রেহাই পাবে না। কুরআনে বলা হয়েছে : যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, তিনিই আবার তা পুনরুজ্জীবিত করবেন। (সূরা ইয়াসিন: ৭৯)। মানুষের পক্ষে একটি মৃত প্রাণীকে জীবিত করা অসম্ভব, কিন্তু আল্লাহ মৃত হাড়কেও পুনরায় জীবিত করবেন। এটাই তাঁর অসীম ক্ষমতার পরিচয়।
আল্লাহর ক্ষমতা শুধু শাস্তি বা ধ্বংসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তাঁর রহমতও অসীম। তিনি বান্দার গোপন কথা জানেন, মনের কষ্ট বোঝেন এবং বিপদে সাহায্য করেন। একজন অসহায় মানুষ যখন আন্তরিকভাবে আল্লাহকে ডাকে, তখন তিনি সাড়া দেন। তিনি রোগীকে সুস্থ করেন, দরিদ্রকে রিজিক দেন এবং পথহারা মানুষকে সঠিক পথ দেখান।
বর্তমান যুগে মানুষ প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানে অনেক উন্নতি করেছে। কিন্তু যত আবিষ্কারই হোক না কেন, মানুষ এখনো একটি মশাও সৃষ্টি করতে পারেনি। বিজ্ঞান যত এগোচ্ছে, ততই আল্লাহর সৃষ্টির রহস্য মানুষের সামনে উন্মোচিত হচ্ছে। ফলে মানুষ আরও বেশি উপলব্ধি করছে যে এই বিশ্বজগতের পেছনে একজন মহান স্রষ্টার অসীম ক্ষমতা কাজ করছে।
অতএব, কুরআনের আলোকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে মহান আল্লাহ তাআলা সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ এবং সর্বক্ষমতার অধিকারী। তাঁর কুদরতের সামনে মানুষ অত্যন্ত ক্ষুদ্র ও দুর্বল। তাই মানুষের উচিত অহংকার ত্যাগ করে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করা, তাঁর নির্দেশ মেনে চলা এবং সব কাজে তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করা। কারণ তিনিই একমাত্র সত্তা, যিনি সমগ্র বিশ্বজগতের মালিক এবং যাঁর ক্ষমতার কোনো সীমা নেই।