নিজস্ব প্রতিবেদক : উপকূলীয় জনপদকে জলোচ্ছ্বাস ও বন্যার ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত করতে বাস্তবায়ন করা হয়েছিল হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প। কিন্তু সেই উন্নয়নেরই মূল্য দিচ্ছেন বরগুনার উপকূলবাসী। পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে চীনের সহায়তায় বাস্তবায়িত ‘উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প’-এর আওতায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় বেড়িবাঁধ উঁচু ও প্রশস্ত করার সময় বহু পাকা সড়ক মাটি দিয়ে ঢেকে কাঁচা করে ফেলা হয়। প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে প্রায় ছয় বছর আগে। অথচ আজও সেই সড়কগুলো পুনরায় পাকাকরণ হয়নি। চলতি বর্ষায় কর্দমাক্ত ও ভাঙাচোরা সড়কে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন জেলার লক্ষাধিক মানুষ।
সরেজমিনে আমতলী, তালতলী, পাথরঘাটা ও বরগুনা সদরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সামান্য বৃষ্টিতেই কাঁচা সড়কগুলো কাদার সাগরে পরিণত হচ্ছে। কোথাও হাঁটুসমান কাদা, কোথাও বড় বড় গর্তে জমে আছে পানি। এতে মোটরসাইকেল, অটোরিকশা, ভ্যান, পিকআপ এমনকি রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স চলাচলও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। অনেক স্থানে যানবাহন আটকে থাকায় রোগীদের সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। শিক্ষার্থীদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে। কৃষক ও জেলেরা উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করতে গিয়ে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করছেন।
.
স্থানীয়দের অভিযোগ, উপকূল রক্ষার নামে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে ফেলা হলেও তা পুনর্বাসনের বিষয়ে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে যে উন্নয়ন মানুষের জীবনকে সহজ করার কথা ছিল, সেটিই আজ জনদুর্ভোগের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
.
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, জেলার বিভিন্ন পোল্ডারে ১০০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ উন্নয়ন এবং নতুন স্লুইস গেট নির্মাণ ও পুরোনো গেট সংস্কারের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। উপকূল সুরক্ষায় এসব অবকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ হলেও ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরো প্রকল্পের সুফলকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
এদিকে বরগুনা এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে যেসব সড়ক কাঁচা অবস্থায় রয়েছে, সেগুলোর অধিকাংশই আগে পাকা ছিল। বেড়িবাঁধ উঁচু করার সময় ওই পাকা সড়কগুলো মাটি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। তবে এলজিইডির নথি ও সরকারি ম্যাপে এসব সড়ক এখনো পাকা সড়ক হিসেবেই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এসব সড়ক পুনরায় পাকাকরণ করতে হলে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট একাধিক মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। সেই সমন্বয় না হওয়ায় বছরের পর বছর ঝুলে আছে সড়ক পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ।
বর্ষা মৌসুমে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছেন শিক্ষার্থী, কৃষক, জেলে, গর্ভবতী নারী, শিশু ও অসুস্থ রোগীরা। জরুরি রোগী নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছাতে বিলম্ব হচ্ছে। কৃষিপণ্য ও মাছ পরিবহনে বাড়তি ব্যয় গুনতে হচ্ছে। এতে স্থানীয় অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বরগুনা জেলা নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও সাংবাদিক মনির হোসেন কামাল বলেন, “উপকূল রক্ষায় বেড়িবাঁধ নির্মাণ অবশ্যই প্রয়োজনীয় ছিল। কিন্তু মানুষের চলাচলের একমাত্র সড়কগুলো নষ্ট করে রেখে দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। ছয় বছর ধরে মানুষ সীমাহীন কষ্ট ভোগ করছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বয়ে দ্রুত সড়কগুলো পাকাকরণের উদ্যোগ নিতে হবে।
বরগুনা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট সোহেল হাফিজ বলেন, “এটি পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের ঘাটতির বাস্তব চিত্র। উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের সময় যোগাযোগ ব্যবস্থার বিষয়টি গুরুত্ব পেলে আজ মানুষকে এমন দুর্ভোগে পড়তে হতো না। এখন আর দেরি না করে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।
আমতলীর বাসিন্দা আব্দুল করিম বলেন, “বৃষ্টি হলেই রাস্তায় চলাচল বন্ধ হওয়ার মতো অবস্থা হয়। মোটরসাইকেল চালাতে ভয় লাগে। অনেক সময় রোগী নিয়ে বের হওয়াও সম্ভব হয় না।
গোলবুনিয়া বাজারের ভ্যানচালক মো. জাফর ইকবাল বলেন, “কাঁচা রাস্তার কারণে গাড়ি চালাতে গিয়ে প্রতিদিন ক্ষতির মুখে পড়ছি। আগে কয়েকটি ট্রিপ দিতে পারলেও এখন একটি ট্রিপ শেষ করতেই অনেক সময় লাগে। আয় কমে গেছে, সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্কুলছাত্রী সুমাইয়া আক্তার জানায়, “স্কুলে যাওয়ার পথে প্রায়ই কাদায় পিছলে পড়ি। বই-খাতা ও পোশাক নষ্ট হয়। অনেক সময় সময়মতো ক্লাসেও পৌঁছাতে পারি না।
দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগের প্রতিবাদে বিভিন্ন এলাকায় মানববন্ধন, বিক্ষোভ, স্মারকলিপি প্রদানসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছেন স্থানীয়রা। কোথাও কোথাও প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে কাঁচা সড়কে ধানের চারা রোপণও করা হয়েছে। কিন্তু সমস্যার স্থায়ী সমাধান আজও মেলেনি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় রাস্তা পাকাকরণের কোনো বরাদ্দ ছিল না। পৃথক প্রকল্পের মাধ্যমে সড়ক উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন- পরিকল্পনার কথা শুনতে শুনতে ছয় বছর পার হয়ে গেলেও বাস্তব কাজ শুরু হবে কবে?
উপকূল রক্ষার উন্নয়ন প্রকল্প নিঃসন্দেহে প্রয়োজনীয়। কিন্তু সেই উন্নয়নের কারণে যদি মানুষের নিত্যদিনের চলাচল দুর্বিষহ হয়ে ওঠে, তাহলে উন্নয়নের প্রকৃত উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। বরগুনার উপকূলবাসীর প্রত্যাশা, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের মাধ্যমে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো পুনর্নির্মাণ করে নিরাপদ যোগাযোগ নিশ্চিত করা হবে। অন্যথায় বর্ষা এলেই কাদার ফাঁদে বন্দি হয়ে থাকবে উপকূলের হাজারো মানুষের জীবনযাত্রা।