1. diggilseba@gmail.com : admin :
  2. ashadul@barisalcrimetrace.com : Ashadul Islam : আসাদুল ইসলাম
  3. hafiz@barisalcrimetrace.com : barisal CrimeTrace : barisal CrimeTrace
  4. mahadi@barisalcrimetrace.com : মাহাদী হাসান : মাহাদী হাসান
ভোলা থেকে হিমালয় চূড়া, মুহিতের রোমাঞ্চকর উপাখ্যান - বরিশাল ক্রাইম ট্রেস
শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৪ অপরাহ্ন
শিরোনাম

ভোলা থেকে হিমালয় চূড়া, মুহিতের রোমাঞ্চকর উপাখ্যান

  • আপডেট সময় : শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এভারেস্টের চূড়ায় পা রাখার রোমাঞ্চকর গল্প শুনিয়ে এই প্রজন্মকে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখালেন দুই দিক থেকে হিমালয় জয় করা একমাত্র বাঙালি পর্বতারোহী এম. মুহিত।

বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) দিবাগত রাতে একদল স্বপ্নবাজ তরুণ-তরুণীর মুখোমুখি বসে তিনি উন্মোচন করেন তার দীর্ঘ অভিযাত্রার ডায়েরি। সেই গল্প শুধু বরফ আর পাহাড় কাটার বিবরণ ছিল না; তাতে ছিল বুকভরা স্বপ্ন, খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস, বারবার ব্যর্থতা, মৃত্যুর মুখ থেকে অলৌকিক প্রত্যাবর্তন আর হৃদয়ের গভীরে দেশপ্রেমের এক অনন্য মহাকাব্য।

বরিশাল বিভাগের ভোলা জেলার বোরহানউদ্দীন উপজেলার সন্তান এম মুহিত। শৈশবের একটা বড় অংশ ইট-পাথরের ঢাকায় কাটলেও, স্কুলের ছুটি পেলেই তিনি ছুটে যেতেন গ্রামের মুক্ত বাতাসে। তেঁতুলিয়া নদীর উত্তাল ঢেউ, প্রকৃতির উন্মুক্ত আঙিনা আর মাইলের পর মাইল বিস্তৃত সবুজই মূলত তার অবচেতন মনে বুনে দিয়েছিল প্রকৃতি প্রেমের বীজ।

২০০১ সালে এক অদ্ভুত মোড় আসে তার জীবনে। পর্বতারোহী ইমান আল হকের সঙ্গে কেবল ‘পাখি দেখতে’ গিয়ে প্রথমবার পাহাড়ের প্রেমে পড়েন মুহিত। সেই যে পাহাড়ের নেশা বুকে চেপে বসল, তা আর কোনোদিনও তাকে ছাড়েনি। দেশের সব ক’টি উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় লাল-সবুজ পতাকা ওড়ানোর পর তার মনে হলো, এবার ডানা মেলতে হবে আরও উঁচুতে, আরও কঠিন কোনো লক্ষ্যভেদে। সেখান থেকেই শুরু বিশ্বের ছাদ ‘এভারেস্ট’ জয়ের মহাকাব্যিক স্বপ্ন।

তিন ভাই ও চার বোনের পরিবারে মুহিতের এমন ঝুঁকিপূর্ণ স্বপ্নকে মেনে নেওয়া সহজ ছিল না। বাবা স্বাভাবিকভাবেই চাইতেন না তার সন্তান এমন কোনো অভিযানে যাক, যেখানে প্রতি পদে ওত পেতে থাকে মৃত্যু। তবে বাবার কড়া শাসনের আড়ালে মা ও ভাই-বোনেরা সবসময় জোগান দিয়েছেন বুকভরা সাহস। পরিবারের সেই নীরব মানসিক সমর্থনই মুহিতকে বারবার প্রতিকূলতার দেয়াল ভাঙতে শক্তি দিয়েছে।

২০০৪ সালে শুরু হয় এভারেস্ট অভিযানের প্রস্তুতি। বছরের পর বছর কঠোর অনুশীলন, মানসিক দৃঢ়তা এবং আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণের পর ২০১০ সালে প্রথমবারের মতো এভারেস্ট অভিযানে অংশ নেন।

কিন্তু প্রকৃতির নির্মম রূপ তাকে শিখরের একেবারে কাছ থেকে ফিরিয়ে দেয়। বৈরী আবহাওয়ার কারণে ফিরে আসতে হয়। অনেকের কাছে সেটি ছিল ব্যর্থতা, কিন্তু এম মুহিত সেটিকে দেখেছেন শিক্ষা হিসেবে।

তিনি বলেন, পাহাড় আমাকে শিখিয়েছে, পিছিয়ে আসাও কখনো কখনো সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি।

অবশেষে প্রথম বার তিব্বতের উত্তর দিক থেকে ২০১১ সালের ২১ মে বাংলাদেশি হিসেবে এভারেস্টের চূড়ায় লাল-সবুজের পতাকা ওড়ান এম মুহিত। এক বছর পর, ২০১২ সালের ১৯ মে আবারও নেপালের দক্ষিণ দিক দিয়ে এভারেস্ট জয় করেন।

নেপাল ও তিব্বত – দুই দিক থেকেই এভারেস্ট জয় করা একমাত্র বাঙালি হিসেবে নিজের নাম স্থায়ীভাবে লিখে রাখেন বিশ্ব পর্বতারোহণের ইতিহাসে।

এভারেস্ট অভিযানে তিনবার ভয়াবহ তুষারধসের মুখোমুখি হয়েছেন এম মুহিত।

২০১০ সালে প্রায় এক ঘণ্টা মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেছেন। ২০১২ সালেও আরও দুইবার প্রাণঘাতী তুষারধস থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরেন। সেই ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে হাসিমুখেই তিনি বলেন, আমি এখন বোনাস লাইফ কাটাচ্ছি। প্রতিটি দিনই আমার কাছে নতুন করে পাওয়া জীবন।

এভারেস্ট জয় ছিল না তার যাত্রার শেষ অধ্যায়। বিশ্বের ৮ হাজার মিটারের ১৪টি পর্বতের মধ্যে তিনটি শৃঙ্গে চারবার আরোহণ করেছেন তিনি। জয় করেছেন বিশ্বের ষষ্ঠ সর্বোচ্চ পর্বত চো-ওইয়ু, অষ্টম সর্বোচ্চ মানাসলুসহ একাধিক দুর্গম পর্বতশৃঙ্গ।

এছাড়া সাত হাজার মিটারের একটি এবং ছয় হাজার মিটারের আটটি শৃঙ্গে দশবারের বেশি সফলভাবে আরোহণ করে বাংলাদেশের পতাকাকে নিয়ে গেছেন বিশ্বের সর্বোচ্চ উচ্চতায়।

নিজের সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় প্রেরণা হিসেবে এম মুহিত স্মরণ করেন তার মেন্টর ইমান আল হককে।

তিনি বলেন, আমার গুরু আমাকে শিখিয়েছেন, পাহাড়কে কখনো জয় করা যায় না। পাহাড়কে সম্মান করতে হয়। প্রকৃতির সামনে মানুষ সবসময়ই ছোট।

তার ভাষায়, পর্বতারোহণ তাকে শুধু শারীরিক শক্তিই দেয়নি; শিখিয়েছে ধৈর্য, বিনয়, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং সংকটের মধ্যেও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা।

তরুণদের উদ্দেশে এম মুহিত বলেন, বড় স্বপ্ন দেখতে হলে আগে নিজেকে গড়ে তুলতে হবে।

তিনি জানান, জীবনে কখনো ধূমপান কিংবা অ্যালকোহল স্পর্শ করেননি। সুস্থ জীবনযাপন, নিয়মিত অনুশীলন ও কঠোর আত্মনিয়ন্ত্রণই তাকে বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন অভিযানে বারবার সফল হতে সাহায্য করেছে।

দেশের জন্য অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পেয়েছেন এম মুহিত। তবে তার কাছে সবচেয়ে বড় পুরস্কার কোনো পদক নয়।

তার ভাষায়, আমার গল্প শুনে যদি একজন তরুণও নিজের স্বপ্ন পূরণের পথে সাহস নিয়ে এগিয়ে যায়, সেটাই হবে আমার সবচেয়ে বড় অর্জন।

অনুষ্ঠান শেষে দীর্ঘ করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো মিলনায়তন। কিন্তু করতালির শব্দ মিলিয়ে যাওয়ার পরও এম মুহিতের কথাগুলো যেন থেকে যায় উপস্থিত সবার হৃদয়ে।

কারণ, এভারেস্টের গল্প শুনতে এসে তারা উপলব্ধি করেছেন, শিখর মানে শুধু বরফে ঢাকা কোনো পাহাড় নয়; শিখর মানে মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তি, অবিচল সাহস, নিরলস পরিশ্রম এবং অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার বিশ্বাস।

পোস্টটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আরও নিউজ
© All rights reserved © 2025 Barisal Crime Trace
Theme Customized By Engineer BD Network