নিজস্ব প্রতিবেদক : প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি সেতু দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু সেই সেতু দিয়ে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করার কোনো উপায় নেই। দুই প্রান্তে নেই সংযোগ সড়ক।
ফলে ছয় বছর ধরে কার্যত অচল হয়ে পড়ে রয়েছে পটুয়াখালীর দশমিনা ও বাউফল উপজেলার সীমান্তবর্তী বাঁশবাড়িয়া-বগী খালের ওপর নির্মিত সেতুটি। স্থানীয়দের অভিযোগ, নকশাগত ত্রুটির কারণে সংযোগ সড়কের কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দুই উপজেলার অন্তত ১১ গ্রামের হাজারো মানুষ প্রতিদিন চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বগী বাজারের দক্ষিণ পাশে নির্মিত সেতুটির দুই প্রান্তে এখনো সংযোগ সড়ক তৈরি হয়নি। প্রায় ২০ ফুট উঁচু সেতুতে ওঠানামার জন্য স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেরাই ইটের ব্লক দিয়ে অস্থায়ী সিঁড়ি বানিয়েছেন। কেউ কেউ বাঁশের সাঁকো ব্যবহার করে চলাচল করছেন। নারী, শিশু, শিক্ষার্থী, বৃদ্ধ থেকে শুরু করে কৃষক-সবাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন এভাবেই সেতু পার হচ্ছেন।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্র জানায়, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২৪ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৭ মিটার প্রস্থের আরসিসি গার্ডার সেতুটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় ২ কোটি ৮২ লাখ ১০ হাজার ৫০৬ টাকা। পটুয়াখালীর মেসার্স আবুল কালাম আজাদ এন্টারপ্রাইজ সেতুর নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করে। ২০২০ সালের শেষ দিকে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সংযোগ সড়ক নির্মাণের সময় নকশাগত ত্রুটি ধরা পড়ায় পুরো প্রকল্পের কাজ স্থগিত হয়ে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. আবদুল হাই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা না করেই সেতুর নকশা করা হয়েছিল। মূল সেতু নির্মাণের পর সংযোগ সড়ক করতে গিয়ে ভুল ধরা পড়ে। এরপর ছয় বছর কেটে গেলেও আর কোনো কাজ শুরু হয়নি। কোটি কোটি টাকা খরচ করে বানানো সেতু আমাদের কোনো উপকারেই আসছে না।” একই এলাকার বাসিন্দা মশিউর রহমান লাবু বলেন, “প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এই সেতু ব্যবহার করতে গিয়ে দুর্ভোগে পড়ছেন। বিশেষ করে নারী, শিশু, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও বয়স্কদের জন্য এটি ভয়ংকর ঝুঁকিপূর্ণ। ইতোমধ্যে কয়েকটি দুর্ঘটনাও ঘটেছে। অথচ সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।
কৃষক সোহরাব মিয়া বলেন, “সংযোগ সড়ক না থাকায় কালাইয়া দক্ষিণ বাজারে কৃষিপণ্য নিতে প্রায় ৩০ কিলোমিটার ঘুরে যেতে হয়। এতে পরিবহন খরচ বেড়ে যায়, লাভ তো দূরের কথা, অনেক সময় লোকসান গুনতে হয়।
শুধু সাধারণ মানুষ নন, সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। কর্পূরকাঠি ইসলামিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তুষার কান্তি ঘোষ বলেন, “এই সেতুর ওপর নির্ভরশীল মাধ্যমিক বিদ্যালয়, প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি মাদ্রাসার শত শত শিক্ষার্থী। সংযোগ সড়ক না থাকায় তারা ইটের সিঁড়ি ও বাঁশের সাঁকো ব্যবহার করে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে। এতে প্রায়ই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। অনেক অভিভাবক সন্তানদের নিরাপত্তার কারণে নিয়মিত বিদ্যালয়ে পাঠাতে চান না, ফলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও কমে যাচ্ছে।
এলজিইডির তথ্যমতে, প্রকল্পটির নকশায় ত্রুটি ধরা পড়ার পর নতুন করে নকশা প্রণয়ন করা হয়েছে। তবে এখনো সংযোগ সড়কের কাজ শুরু হয়নি। দশমিনা উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী মো. মকবুল হোসেন বলেন, “আমি যোগদানের আগেই সেতুর নকশা করা হয়েছিল। পরে নকশাগত ত্রুটি ধরা পড়ায় সংযোগ সড়কের কাজ বন্ধ রাখতে হয়। ইতোমধ্যে নতুন নকশা অনুমোদন হয়েছে। দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ হলেই সংযোগ সড়কের নির্মাণকাজ শুরু করা হবে।” দশমিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদ হাসান মৃধা বলেন, “মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। এলজিইডির সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তারা দ্রুত সংযোগ সড়কের নির্মাণকাজ শুরু করার আশ্বাস দিয়েছে।” স্থানীয়দের আশা, দীর্ঘ ছয় বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে দ্রুত সংযোগ সড়কের কাজ শেষ করা হবে। তা না হলে কোটি টাকার এই সেতু কেবল উন্নয়নের প্রতীক হয়েই দাঁড়িয়ে থাকবে, আর দুই উপজেলার হাজারো মানুষের দুর্ভোগ চলতেই থাকবে।