নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল: কারও কাঁধে স্কুলব্যাগ, কারও হাতে বই-খাতা। কেউ মায়ের কোলে, আবার কেউ হাঁটুপানিতে ভিজে পার হচ্ছেন খাল। কারও গন্তব্য বিদ্যালয়, কারও চিকিৎসাকেন্দ্র। কিন্তু সবার পথেই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি সেতুর অভাব। বান্দরবানের লামা উপজেলার গজালিয়া ইউনিয়নের সাত গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষ প্রতিদিন বমু খাল পার হচ্ছেন ঝুঁকি নিয়ে।
শুধু স্থানীয় বাসিন্দারাই নন, খালের দুই পাড়ের তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৬০০ শিক্ষার্থীকেও প্রতিদিন এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ পাড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হয়। বর্ষায় পানির স্রোত বেড়ে গেলে দুর্ভোগ আরও চরমে ওঠে। তখন অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। রোগী কিংবা গর্ভবতী নারীকে দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বান্দরবান-লামা সড়ক থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার ভেতরে গজালিয়া ইউনিয়নের ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের গ্রামগুলো। বাইশফাঁড়ি ও চিত্তাবান পাড়ার মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে প্রায় ১৮০ ফুট প্রশস্ত বমু খাল। খালের এক পাশে তিনটি এবং অন্য পাশে চারটি গ্রাম।
চিত্তাবান পাড়া, পশ্চিম বাইশফাঁড়ি, নয়াপাড়া, তুলাতলী মুরুং, মারমা পাড়া, ঢেকিছড়া ও হেডম্যান পাড়াসহ সাতটি গ্রামের অধিকাংশ বাসিন্দা ম্রো, মারমা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর। তাদের বড় একটি অংশ কৃষিকাজ ও জুমচাষের ওপর নির্ভরশীল।
খালের এক পাশে বাইশফাঁড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং অন্য পাশে চিত্তাবান পাড়া ও বড়থলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এসব বিদ্যালয়ের প্রায় ৬০০ শিক্ষার্থীকে প্রতিদিন বমু খাল পার হয়ে যাতায়াত করতে হয়।
চিত্তাবান ও বাইশফাঁড়ি পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী পাউঙি ম্রো এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাংইয়ং ম্রো বলেন, প্রতিদিন খাল পার হয়ে তাদের স্কুলে যেতে হয়। অনেক সময় বই-খাতা ও পোশাক ভিজে যায়। পানি বেশি থাকলে খাল পার হতে ভয় লাগে এবং তখন অনেকেই স্কুলে যেতে পারে না। সেখানে একটি সেতু হলে তাদের অনেক সুবিধা হতো।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, খালের পানি কখনো হাঁটুসমান থাকলেও বৃষ্টি হলে স্রোত বেড়ে যায়। তখন অভিভাবকদের সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগে থাকতে হয়। অনেক সময় সন্তানদের কোলে নিয়ে খাল পার করে বিদ্যালয়ে পৌঁছে দিতে হয়।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাকির হোসাইন বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য বমু খালের ওপর সেতু নির্মাণ অত্যন্ত জরুরি। খালের পানি বেড়ে গেলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা বাড়ে।’
সেতুর অভাবে শুধু শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাই নয়, স্থানীয় কৃষিতেও এর প্রভাব পড়েছে। এলাকার বাসিন্দাদের বড় একটি অংশ জুম ও কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু খাল পারাপারের ঝুঁকি ও যোগাযোগ সমস্যার কারণে পাইকারি ব্যবসায়ীরা অনেক সময় এলাকায় যেতে চান না।
নয়াপাড়া ও মুরুং পাড়ার বাসিন্দা উচহ্লা ও সিংপাক ম্রো বলেন, ‘আমাদের অনেকেই জুম ও কৃষিকাজ করে সংসার চালাই। সেতু না থাকায় পাইকারি ব্যবসায়ীরা আসতে চান না। কৃষিপণ্য বিক্রি করতে অনেক দূরে যেতে হয়। এতে সময় ও খরচ দুটোই বাড়ে, আবার ন্যায্যমূল্যও পাওয়া যায় না।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সেতু নির্মাণের দাবি জানানো হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। তাদের দাবি, অন্তত দুটি সেতু নির্মাণ করা হলে সাত গ্রামের মানুষের যোগাযোগব্যবস্থা সহজ হওয়ার পাশাপাশি কৃষিপণ্য বাজারজাত, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বড় পরিবর্তন আসবে।
বাইশফাঁড়ির স্থানীয় এনজিওকর্মী অংথোয়াইনু মারমা হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘ব্রিজ হবে হবে বলে বহুবার লোক এসে মাপজোখ করে গেছে। ফিতা টেনে দাগ দিয়ে চলে যায়, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না।’
গজালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান উচাছিং মারমা বলেন, এখানে একটি সেতু নির্মাণ অত্যন্ত জরুরি। তবে ইউনিয়ন পরিষদের বরাদ্দ কম থাকায় এ মুহূর্তে প্রকল্প নেয়া সম্ভব হচ্ছে না।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী রনি সাহা বলেন, সেতুটি এলাকার মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টি বাস্তবায়নের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগের অবসানে দ্রুত বমু খালের ওপর সেতু নির্মাণ করা হবে। এতে সাত গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থী, কৃষক ও রোগীদের ভোগান্তিও কমবে।