নিজস্ব প্রতিবেদক : উপকূলীয় জেলা বরগুনায় চলতি মৌসুমে তরমুজের বাম্পার ফলন হলেও চাষিদের কপালে হাসি নেই। ডিজেল সংকট, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, হিমাগারের অভাব এবং পাইকারি ক্রেতার অনুপস্থিতিতে চরম বিপাকে পড়েছেন তারা। মাঠভর্তি পাকা তরমুজ বিক্রি না হওয়ায় অনেক ক্ষেতেই তা পচে যাচ্ছে, আর যা বিক্রি হচ্ছে, তা হচ্ছে পানির দরে। ফলে লাভ তো দূরের কথা, উৎপাদন খরচ ওঠানোই এখন দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জেলার বুড়িরচর, মানিকখালী, মাইঠা, এম বালিয়াতলী, নলটোনা, বদরখালী, আঠারোগাছিয়া, চাওড়া, হলদিয়া, শারিকখালী, সোনাকাটা, নিশানবাড়িয়া, বড়বগি, কালমেঘা, কাকচিড়া, চরদুয়ানী, কাজিরাবাদ ও হোসনাবাদসহ বিভিন্ন গ্রাম ও ইউনিয়নে এ বছর তরমুজের ব্যাপক আবাদ হয়েছে। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় প্রায় ১২ হাজার ৩২৪ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে, যার মধ্যে শুধু সদর উপজেলাতেই রয়েছে প্রায় ৬ হাজার হেক্টর।
কৃষকেরা বলছেন, মৌসুমের শুরুতেই আকস্মিক ভারী বৃষ্টিতে অনেক ক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে যায়। এতে পরিপক্ক তরমুজ নষ্ট হয়ে যায়। এর ওপর যোগ হয়েছে পরিবহন সংকট। ডিজেলের অজুহাতে ট্রাক ভাড়া ৩৫ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৫০ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা আগের মতো আর আসছেন না।
সদর উপজেলার কৃষক ফজলুর রহমান হাওলাদার বলেন, ‘৪ একর জমিতে তরমুজ চাষে প্রায় ৫ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু বৃষ্টি আর জলাবদ্ধতায় অনেক তরমুজ নষ্ট হয়ে গেছে। বাজারে নিলেও দাম এত কম যে খরচই উঠছে না।’
তালতলী উপজেলার সোনাকাটা ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল হক ফরাজী বলেন, ‘ঋণ করে চাষ করেছি। এখন পাইকার নেই, গাড়ি নেই। এভাবে চললে আমরা পথে বসবো।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, হিমাগার বা আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে তারা তরমুজ ধরে রাখতে পারছেন না। ফলে বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই উৎপাদন খরচের অর্ধেক দামে বিক্রি করতে হচ্ছে, আবার অনেক তরমুজ অবিক্রীত অবস্থায় মাঠেই পড়ে নষ্ট হচ্ছে।
বরগুনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক রথীন্দ্রনাথ বিশ্বাস বলেন, ‘এ বছর ফলন ভালো হয়েছে, তবে আকস্মিক বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে কিছু ক্ষতি হয়েছে। পাশাপাশি পরিবহন সংকট ও বাজার ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতায় কৃষকেরা প্রত্যাশিত মূল্য পাচ্ছেন না।’
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বরগুনা পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর মো. ইকবাল হাসান শাহিন বলেন, ‘এই সংকট থেকে উত্তরণে দ্রুত সরকারি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। হিমাগার নির্মাণ, সহজ পরিবহন ব্যবস্থা এবং সরাসরি বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করা না গেলে কৃষকেরা ভবিষ্যতে তরমুজ চাষে আগ্রহ হারাবে।’
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে প্রায় ১৫ হাজার ৮৩৮ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ৪ হাজার ৩২৬ হেক্টর বেশি। মোট উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৯২ হাজার ৩২৫ টন তরমুজ।
তবে উৎপাদন বেশি হলেও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও পরিবহন সংকটের কারণে সব কৃষক সমানভাবে লাভবান হতে পারেননি। জেলা কৃষি অফিস জানায়, উৎপাদিত তরমুজের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে বিক্রি হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। কিন্তু মাঠপর্যায়ের অনেক চাষি ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় লোকসানের মুখে পড়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পনাহীন উৎপাদন বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জ্বালানি ও পরিবহন সংকট এবং দুর্বল বাজার ব্যবস্থাপনার সম্মিলিত প্রভাবে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে বরগুনার তরমুজ খাত বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটে পড়বে, যার প্রভাব পড়বে হাজারো কৃষক পরিবারের জীবিকা ও স্থানীয় অর্থনীতিতে।