নিজস্ব প্রতিবেদক : পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় বেড়িবাঁধের বাইরের অন্তত ছয় হাজার পরিবারের জলোচ্ছ্বাস ঝুঁকি বহুগুনে বেড়েছে। বর্ষা শুরু হলেই উপকূলীয় এই জনপদের মানুষের মনে ভর করে এক অজানা আতঙ্ক। আকাশে মেঘ জমা, সাগরে নিম্নচাপ কিংবা পূর্ণিমার জোয়ারের খবর এলেই বেড়িবাঁধের বাইরের গ্রামের মানুষ রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। কারণ, যে কোনো মুহূর্তে জলোচ্ছ্বাসের পানি হামলে পড়তে পারে তাদের বসতভিটায়। ২০২৫ সালের বর্ষা মৌসুমেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। অস্বাভাবিক জোয়ার, নিম্নচাপজনিত জলোচ্ছ্বাস এবং টানা বর্ষণে কলাপাড়ার অন্তত ছয়টি ইউনিয়নের উপকূলীয় জনপদে সৃষ্টি হয় ভয়াবহ মানবিক সংকট। কিন্তু এবছর বর্ষা মৌসুমে স্বাভাবিক জোয়ারেও পানির উচ্চতা ক্রমশ বাড়ছে। তিন নম্বর সতর্ক সঙ্কেতকালীন সময় জলোচ্ছ্বাসে ডুবে যায় বাড়িঘর। রান্নার চুলা পর্যন্ত ডুবছে। বাস উপযোগিতা হারানোর শঙ্কায় পড়েছেন এসব মানুষ। অেেনকেই বলছেন ৫০ বছর ধরে বসবাস করছেন। কিন্তু এখন পানির চাপ ক্রমশ বাড়ছে। ঘরের ভিটি উচু করেও শেষ রক্ষা হয় না।
টিয়াখালী পশ্চিম লোন্দা সেতুর পূর্বপাশে ধানখালীর লোন্দায় বেড়িবাঁধের বাইরে প্রায় ২৫০ পরিবারের বসবাস। তারা জানান, এবছর পানির চাপ এতো বেশি যে বাড়িঘরে থাকতে পারছেন না। ওখানকার বাসীন্দা হালিমা আয়শা জানান, অমাবস্যা-পুর্ণিমার জোতে থাকেন পানিবন্দী। এখন নরমাল জোবায়ও পানির উচ্চতা ক্রমশ বাড়ছে। বাড়িঘর ডুবে যায়। আর তিন নম্বর সীগন্যাল থাকলে তো সব ডুবে যায়। তাঁদের প্রটেকশনের নিজস্ব রিং বেড়িবাঁধটিও ভেঙে গেছে। আজ শনিবার দুপুরেও অস্বাভাবিক জোয়ার বইছে। জোয়ারের সময় পানিতে সব থৈ থৈ করে। বাস উপযোগিতা থাকছে না। রাতের বেলা জলোচ্ছ্বাসের ভয়ে জেগে থাকতে হয়। নীলগঞ্জের সলিমপুর গ্রামে বেড়িবাঁধের বাইরের বাসীন্দা শিক্ষার্থী নুরুল করিম জানান, এখন পুর্ণিমা-অমাবস্যার সময় জোয়ার জলোচ্ছ্বাসে পরিণত হয়। এমনটা চলছে গত তিন বছর ধরে। ক্রমশ পানির চাপ বাড়ছে। নরমাল সময়ে আগে এমন আর দেখেননি। সমস্যার যেন শেষ নেই।
ধানখালীর সাবেক চেয়ারম্যান রিয়াজউদ্দিন তালুকদার জানান, শুধুমাত্র লোন্দা থেকে নমরহাট বাজার পর্যন্ত এভাবে বেড়িবাঁধের বাইরে ঝুঁকিপুর্ণ বসবাস করছে প্রায় এক হাজার পরিবার। পুরো ইউনিয়নে রয়েছে আরও অন্তত পাঁচ শ’ পরিবার। তিনি জানালেন, ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে এসব পরিবারে প্রাণহানির ঝুঁকি থাকছেই। তারপরও ঝুঁকি নিয়ে মানুষগুলো বসবাস করছেন। এরা আগে বেড়িবাঁধের স্লোপে থাকতেন। এখন বাঁধের উন্নয়নসহ ওইসব এলাকা অধিগ্রহণ করা হয়েছে। রাস্তাগুলো সম্প্রসারন করা হয়েছে। বাঁধের স্লোপ থেকে এরা উচ্ছেদ হয়ে গেছে। চম্পাপুর ইউনিয়নে বেড়িবাঁধের বাইরে ঝুঁকি নিয়ে বাস করছে অন্তত ৬০টি পরিবার। চরম ঝুকিপুর্ণ বসবাস তাঁদের।
বালিয়াতলীর চেয়ারম্যান এবিএম হুমায়ুন কবির জানান, তার ইউনিয়ন বালিয়াতলীর চরনজীব থেকে বাবলাতলা বাজার পর্যন্ত প্রায় দুই শ’ পরিবার বেড়িবাঁধের বাইরে থাকছে। এ ছাড়াও পক্ষিয়াপাড়া বাজার থেকে শনিবারের বাজার পর্যন্ত আরও সাত আটটি পরিবার বাঁধের বাইরে ঝুকিপুর্ণ বসবাস করছে। ডালবুগঞ্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাওলানা হেদায়েত উল্লাহ জেহাদী জানান, ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের পুর্ব ডালবুগঞ্জ ৪১ ঘর। গাববাড়িয়া বাঁধ থেকে মেহেরপুর পর্যন্ত ৪৫টি। ডালবুগঞ্জ, থানখোলা স্লুইস, রসুলপুর, পেয়ারপুর, ফুলবুনিয়ায় ৪০টি এবং মনষাতলী, খাপড়াভাঙ্গা ও বরকুতিয়ায় আরও ৩০টি পরিবার বেড়িবাঁধের বাইরে ঝুকিপুর্ণ বসবাস করছে। মিঠাগঞ্জের চেয়ারম্যান মেজবাহ উদ্দিন খান দুলাল জানান, ইউনিয়নের তেগাছিয়া বাজারের আশপাশে ২৫টি। মিঠাগঞ্জে তিনটি, মেলাপাড়া ৪০টি, উত্তর চরপাড়া ৬৮, দক্ষিণ চরপাড়া প্রায় ১০টি এবং মধুখালীর লেকের দুই পাড়ে অন্তত ৬০টি পরিবার ঝুকিপুর্ণ বসবাস করছে। লতাচাপলীর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান জানান, এই ইউনিয়নের সহস্রাধিক পরিবার অস্বাভাবিক জেয়ারের সময় পানিবন্দী থাকে। এসব পরিবার বেড়িবাঁধের বাইরে ঝুকিপুর্ণ বসবাস করছে। মম্বিপাড়া, দক্ষিন মুসুল্লিয়াবাদ, নাইয়রিপাড়া, গোড়া আমখোলা পাড়া, লক্ষীর বাজার এলাকায় এসব পরিবারের বসবাস।
ধুলাসার ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাওলানা আব্দুর রহিম জানান, এখানকার গঙ্গামতি, চরগঙ্গামতি ও কাউয়ারচরে অন্তত দুই হাজার পরিবার খুব ঝুকিপুর্ণ বসবাস করছে। এদের বর্ষা মৌসুমে অস্বাভাবিক জোয়ারে বাড়িঘর পর্যন্ত ছাড়তে হয়। সিডরে এখানে প্রাণহানি ঘটে চার জনের। লালুয়ার চেয়ারম্যান শওকত হোসেন তপন বিশ্বাস জানালেন বেড়িবাঁধের বাইরের ঝুঁকিপুর্ণ সহস্রাধিক পরিবার বসবাস করছে। এক যুগ ধরে বেড়িবাঁধ না থাকায় এসব পরিবারে এখন জীবিকার দূর্ভোগ পরিণত হয়েছে পানির সঙ্গে যুদ্ধ করে। অন্তহীন ভোগন্তি তাদের। একই দৃশ্য ১২টি ইউনিয়নের সর্বত্র। এভাবে অন্তত ছয় হাজার পরিবার বেড়িবাঁধের বাইরে চরম ঝুঁকিপুর্ণ বসবাস করছে। এসব পরিবারের কমপক্ষে ৩০ হাজার মানুষ জীবন, সম্পদের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে। এদের অমাবশ্যা ও পুর্ণিমার সময় বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে কাটে বিনিদ্র রাত। জলোচ্ছ্বাস আতঙ্কে রয়েছে এসব হাজার হাজার পরিবারের মানুষ। আর এখন এই ঝুঁকি আরও বাড়ছে। এসব পরিবারের পুনর্বাসনে এখনই পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে ভুক্তভোগীরা জানান।
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আরিফুজ্জামান জানান, বেড়িবাঁধের বাইরের বাসীন্দাদের জলোচ্ছ্বাসের কবল থেকে রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীদের সঙ্গে আলোচনা করে স্থায়ী একটি পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ শুরু করা হয়েছে।