1. diggilseba@gmail.com : admin :
  2. ashadul@barisalcrimetrace.com : Ashadul Islam : আসাদুল ইসলাম
  3. hafiz@barisalcrimetrace.com : barisal CrimeTrace : barisal CrimeTrace
  4. mahadi@barisalcrimetrace.com : মাহাদী হাসান : মাহাদী হাসান
নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও বরিশালের মেঘনায় প্রতিদিন ৪ কোটি টাকার ইলিশের রমরমা হাট - বরিশাল ক্রাইম ট্রেস
মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০২:০৩ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
ফ্যামিলি কার্ডের ছবি তোলার নামে বিধবার স্বর্ণের দুল নিয়ে উধাও ছাত্রলীগের কমিটিতে ছেলের নাম, জামায়াত নেতা বললেন ‘আগে জানলে ত্যাজ্যপুত্র করতাম’ ওসিকেই ‘মাদকের ডিলার’ বললেন বিএনপি নেতা রাষ্ট্রায়ত্ত তিন ব্যাংকের এমডির নিয়োগ বাতিল মেয়েকে ধর্ষণের দায়ে বাবার যাবজ্জীবন ঘরে বসে জাল টাকা তৈরি, ল্যাপটপ-প্রিন্টারসহ যুবক গ্রেপ্তার ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দিলীপ কুমার আগারওয়ালা গ্রেফতার গ্রাম পুলিশকে দায়িত্ব পালনে আরও গতিশীল হওয়ার আহ্বান এমপি জয়নুল আবেদীনের চরফ্যাশনে মা ইলিশ নিধনের মহোৎসব! গভীর রাতে পাচার, প্রশাসন নীরব তিন মন্দিরে সোনা চুরির ঘটনায় দম্পতি গ্রেপ্তার

নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও বরিশালের মেঘনায় প্রতিদিন ৪ কোটি টাকার ইলিশের রমরমা হাট

  • আপডেট সময় : রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল: মা ইলিশ রক্ষায় নিষেধাজ্ঞা চলছে, তবু বরিশালের মেঘনা অববাহিকায় থেমে নেই ইলিশ শিকার ও বেচাকেনা। স্থানীয় জেলে ও ব্যবসায়ীদের হিসাবে, হিজলা উপজেলার আটটি ঘাটে প্রতিদিন সাড়ে তিন থেকে চার কোটি টাকার ইলিশ হাতবদল হচ্ছে। একদিকে প্রশাসনের অভিযান, অন্যদিকে দুর্গম চর ও মোহনায় দিনরাত জাল ফেলছেন জেলেরা। ফলে অভয়াশ্রম রক্ষার উদ্যোগ প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

মেঘনার এই অংশে ছোট-বড় অসংখ্য ইঞ্জিনচালিত ট্রলার ও নৌকা নিয়ে জেলেরা ইলিশ ধরছেন। নদীর তীরের কয়েকটি ঘাটে সেই মাছ নিলামে বিক্রি হয়। পরে স্পিডবোট ও ট্রলারে করে তা পাঠানো হয় দেশের নানা প্রান্তে। স্থানীয়দের দাবি, হিজলাকে ঘিরে মা ইলিশ শিকার, কেনাবেচা ও পাচারের একটি বড় চক্র সক্রিয় রয়েছে।

গত বুধবার সকালে সরেজমিনে দেখা গেছে, হিজলার বাউশিয়া লঞ্চঘাট, পুরোনো হিজলা নদীর পাড়, দুর্গাপুর, হরিনাথপুর ও আবুপুর এলাকায় অস্থায়ী হাট বসিয়ে ইলিশ বিক্রি হচ্ছে। জানপুর ঘাটে সকালে ক্রেট ভরে ইলিশ আনা হয়, আর বিকেলে জেলেদের নৌকা নিয়ে আবার নদীতে যেতে দেখা গেছে।

ঘাট-নিয়ন্ত্রকদের এক প্রতিনিধির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জানপুর, খালিশপুর ও চরকিল্লার ঘাটগুলোতে নিষেধাজ্ঞার সময়ও প্রতিদিন প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার ইলিশ কেনাবেচা হয়।

আবুপুরের অস্থায়ী বাজারে বিক্রি হয় আরও ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকার মাছ। শরীয়তপুর, মাদারীপুর, চাঁদপুর ও নোয়াখালীসহ বিভিন্ন এলাকার অন্তত ২৫০ জন পাইকার সেখানে অবস্থান করছেন। ঘাটে মাছ বিক্রি করতে হলে কমিশন দিতে হয় ২০ শতাংশ পর্যন্ত।

জেলেদের হিসাবে, ছোট নৌকায় দিনে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকার ইলিশ ধরা পড়ে। বড় ট্রলারে এই অঙ্ক দেড় থেকে দুই লাখ টাকা। এই আয়ের হাতছানিই অনেককে ঝুঁকি নিয়ে নদীতে নামতে উৎসাহ দিচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে নিষেধাজ্ঞার সময় একই মাছ বিপুল দামে বিক্রি হওয়ায় সংশ্লিষ্ট চক্রের মুনাফাও বড় হচ্ছে।

জেলে ও ব্যবসায়ীদের দাবি, জানপুরে অন্তত ২০টি মাছঘাট রয়েছে। অভয়াশ্রমের বড় একটি অংশে শিকারের নিয়ন্ত্রণ হিজলা থেকেই হচ্ছে বলে তাঁরা মনে করেন।

গত ৮ অক্টোবর থেকে মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়েছে। হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার মেঘনা এবং এর শাখা নদ-নদী দেশের গুরুত্বপূর্ণ ইলিশ অভয়াশ্রমগুলোর একটি। অথচ অভিযান শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত দুই দফা হামলার ঘটনা ঘটেছে।

অভিযানের দ্বিতীয় দিন হিজলা-গৌরবদী ইউনিয়নের ওরাকল বাজারের ৭ নম্বর ঘাটসংলগ্ন নদীতে কোস্টগার্ডের দল অভিযানে গেলে হামলার মুখে পড়ে। দলে ছিলেন হিজলা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমানও।

পরিস্থিতি সামলাতে কোস্টগার্ড সদস্যরা ১১টি ফাঁকা গুলি ছোড়েন। গত বৃহস্পতিবার অভিযানে থাকা আরেকটি দলের ওপর হামলায় জেলেদের ছোড়া ইটের আঘাতে এক শ্রমিক মাথায় গুরুতর আঘাত পান।

স্থানীয়দের ভাষ্য, জানপুর, খালিশপুর ও চরকিল্লা অবৈধ শিকার ও বিক্রির মূল কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। আবুপুর সড়কের মোড়ে ছোট নৌকায় ধরা ইলিশের অস্থায়ী হাটও বসে। এসব এলাকা দুর্গম, আবার কয়েকটি জেলার মোহনা হওয়ায় একক কোনো জেলার প্রশাসন অভিযানে গেলে সীমানাজটিলতায় পড়ে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অন্তত দুই হাজার জেলে বড় ট্রলার নিয়ে দিনরাত মাছ ধরছেন বলে তাঁদের দাবি।

প্রতিটি ট্রলারে থাকেন ২০ থেকে ৩০ জন জেলে। অভিযানকারী দল এড়াতে অনেক ট্রলারে দুই-তিনটি ইঞ্জিন বসানো হয়েছে, যেগুলো জেলেদের কাছে ‘ফাইটার’ নামে পরিচিত। আশুলি আবুপুর, আবুপুর ও হরিনাথপুর এলাকার শাখা নদীতেও কয়েক শ ছোট নৌকায় জোড়া ইঞ্জিন লাগিয়ে ইলিশ ধরা হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য, সংঘবদ্ধ জেলেরা অভিযানকারী দল দেখে সহজে পালান না। বরং ইট-পাথর, বাঁশ, লাঠি ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে পাল্টা হামলা করেন। লাঠির মাথায় কাপড় পেঁচিয়ে পেট্রল ঢেলে আগুনের গোলা ছোড়ার অভিযোগও রয়েছে। এ ধরনের আচরণ অভিযানকারীদের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে এবং অভিযানের গতি কমিয়ে দিচ্ছে।

মৎস্য বিভাগ জানায়, বরিশাল সদর উপজেলার কালাবদর নদের হবিনগর থেকে মেহেন্দীগঞ্জের বামনীরচর পর্যন্ত ১৩ কিলোমিটার এলাকা এই অভয়াশ্রমের অংশ। এর সঙ্গে রয়েছে মেহেন্দীগঞ্জের গজারিয়া নদীর হাট থেকে হিজলা লঞ্চঘাট পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার এবং হিজলার মৌলভীর হাট থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম জাঙ্গালিয়া পর্যন্ত ২৬ কিলোমিটার।

২০১৯ সালে এটি দেশের ষষ্ঠ ইলিশ অভয়াশ্রম হিসেবে গেজেটভুক্ত হয়। অর্থাৎ প্রায় ৬৯ কিলোমিটার নদীপথ ঘিরে এই সুরক্ষা-কাঠামো, যা পাহারা দেওয়া সীমিত জনবলে সহজ নয়।

স্থানীয় জেলে, মাছ ব্যবসায়ী ও বিএনপির কয়েকজন নেতার ভাষ্য অনুযায়ী, আগে এসব ঘাটের নিয়ন্ত্রণ ছিল কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের উপজেলা সহসভাপতি ও হিজলা-গৌরবদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামের হাতে।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিয়ন্ত্রণ যায় উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবদুল গাফফার তালুকদারের কাছে। গত বছর তিনি মারা গেলে ঘাটগুলোর নিয়ন্ত্রণ চলে যায় যুগ্ম আহ্বায়ক আলতাফ হোসেন ওরফে খোকন দপ্তরি, সদস্যসচিব দেওয়ান মনির হোসেন এবং গাফফার তালুকদারের দুই ছেলের হাতে।

তাঁদের দাবি অনুযায়ী, জানপুর, খালিশপুর ও চরকিল্লায় দেওয়ান মনিরের দুটি, আলতাফ হোসেনের তিনটি এবং গাফফার তালুকদারের দুই ছেলের দুটি ঘাটে ইলিশ কেনাবেচা হয়। আবুপুরের ঘাটের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বরিশাল জেলা যুবদলের এক নেতা ও হরিনাথপুর ইউনিয়ন বিএনপির এক শীর্ষ নেতার হাতে।

তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আলতাফ হোসেন ও দেওয়ান মনির। আলতাফ হোসেন বলেন, তিনি বিএনপির রাজনীতি করলেও ইলিশ শিকারের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগেই তাঁর ঘাট বন্ধ করা হয়েছে। তাঁর মতে, জেলেরা প্রশাসনের সঙ্গে বেপরোয়া আচরণ করছেন এবং প্রশাসনের ব্যর্থতার কারণেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। দেওয়ান মনিরও জানান, তাঁর ঘাট নিষেধাজ্ঞার আগেই বন্ধ হয়েছে এবং তাঁরা প্রশাসনকে সহায়তা করছেন।

উল্লেখ্য, ঘাট নিয়ন্ত্রণ-সংক্রান্ত এসব দাবি স্থানীয় জেলে, ব্যবসায়ী ও কয়েকজন নেতার বক্তব্যনির্ভর। অভিযুক্তরা তা অস্বীকার করেছেন।

হিজলা উপজেলা মৎস্য বিভাগের একটি সূত্র জানায়, এত বড় এলাকায় নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে বরাদ্দ রয়েছে মাত্র দেড় লাখ টাকা। এই অর্থে তিন-চার দিনের বেশি অভিযান চালানো কঠিন। ফলে শুরুতে অভিযান জোরদার থাকলেও কিছুদিন পর তা থমকে যায়। যেখানে প্রতিদিনই কোটি কোটি টাকার মাছ বিক্রি হচ্ছে, সেখানে এই বরাদ্দ ও প্রতিরোধের সামর্থ্যের ব্যবধান স্পষ্ট।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান বরাদ্দসংকটের কথা স্বীকার করে জানান, প্রতিদিনই অভিযান চলছে। তবে বিপুলসংখ্যক জেলে ও বড় ট্রলারের তুলনায় প্রয়োজনীয় জনবল তাঁদের নেই।

বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ সহকারী পরিচালক মো. আনিসুজ্জামান বলেন, একটি বড় চক্র অবৈধভাবে ইলিশ শিকার করছে। কোস্টগার্ড ও নৌ পুলিশের সহায়তায় অভিযান চলছে। কিন্তু জনবল কম, এলাকাও দুর্গম। জেলেরা বেপরোয়া হওয়ায় নিরাপত্তার ঝুঁকিতে রাতে অভিযান চালানো কঠিন। তাঁর মতে, নৌবাহিনীকে যুক্ত করা না গেলে চক্রটিকে ঠেকানো কঠিন হবে।

সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, মেঘনার এই অংশে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার পথে একসঙ্গে কয়েকটি বাধা কাজ করছে। এলাকার দুর্গমতা ও একাধিক জেলার সীমানা প্রশাসনিক সমন্বয়ে জটিলতা তৈরি করছে। জেলেদের সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ ও হামলার ঝুঁকি অভিযানের গতি কমাচ্ছে। অন্যদিকে সীমিত বরাদ্দ ও জনবল দীর্ঘস্থায়ী নজরদারিকে অসম্ভব করে তুলছে। এর ওপর ঘাট নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ থাকায় প্রশ্ন উঠছে, নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে প্রশাসন কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে।

মা ইলিশ সংরক্ষণের মূল উদ্দেশ্য হলো ডিম ছাড়ার মৌসুমে মাছকে নির্বিঘ্নে প্রজনন করতে দেওয়া, যাতে ভবিষ্যতে ইলিশের উৎপাদন টেকসই থাকে। কিন্তু অভয়াশ্রমের মতো সংবেদনশীল এলাকায় যদি নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও নিয়মিত শিকার চলে, তাহলে এর প্রভাব পড়তে পারে আগামী মৌসুমের মাছের সরবরাহে। পাশাপাশি যেসব জেলে নিয়ম মেনে ঘরে বসে আছেন, তাঁদের কাছেও এটি অসন্তোষের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করছেন, নৌবাহিনীর মতো অতিরিক্ত বাহিনীর সম্পৃক্ততা এবং পর্যাপ্ত বরাদ্দ ছাড়া এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন। নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ হতে এখনো বেশ কয়েক দিন বাকি। এ সময়ের মধ্যে অভিযান জোরদার হয় কি না, সেদিকেই এখন নজর স্থানীয়দের।

পোস্টটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আরও নিউজ
© All rights reserved © 2025 Barisal Crime Trace
Theme Customized By Engineer BD Network