নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল: মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলায় পুরাতন ধলেশ্বরী ও কালীগঙ্গা নদীর আকস্মিক ভাঙনে গত এক মাসে অন্তত ১৫টি বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এর দ্বিগুণসংখ্যক বসতবাড়ি।
ভাঙনের মুখে রয়েছে অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। ভাঙন রোধে প্রায় ৪৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাবনা পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
নদীর পানি কমে যাওয়ার এই অসময়ে ভাঙন দেখা দেওয়ায় উদ্বেগে পড়েছেন নদীতীরের বাসিন্দারা। স্থায়ী বাঁধ না থাকায় ঝুঁকি আরও বেড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের হিসাবে, গত এক দশকে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ছয় শতাধিক পরিবারের বসতভিটা এবং হাজার বিঘা আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
সম্প্রতি উপজেলার বিভিন্ন ভাঙনকবলিত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পুরাতন ধলেশ্বরী ও কালীগঙ্গা নদীর তীরজুড়ে ভাঙনের ক্ষত। কোথাও বসতভিটার মাটি ধসে পড়ছে, কোথাও ফসলি জমি নদীতে মিশে যাচ্ছে। নদীর পাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে বেশ কিছু ঘরবাড়ি।
জাবরা বাজার থেকে ঘিওর সদর ও পয়লা ইউনিয়নের শ্রীধরনগর হয়ে বেগুন নারচী পর্যন্ত পুরাতন ধলেশ্বরী নদীর বিভিন্ন অংশে ভাঙন দেখা দিয়েছে। কালীগঙ্গা নদীর তীরবর্তী বানিয়াজুরী ইউনিয়নের কেল্লাচর, পূর্বকুমল্লী ও নকীববাড়ি এলাকাতেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।
স্থানীয়দের ভাষ্য, গত ১০ বছরে কেল্লাচর ও নকীববাড়ি এলাকায় অন্তত দেড় শতাধিক ঘরবাড়ি এবং প্রায় ২৫০ বিঘা ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। কালীগঙ্গার ভাঙনে সাজ্জাদ হোসেন ও সামছু মুন্সির পরিবারের প্রায় ৪৫ বিঘা জমি ও বসতভিটা বিলীন হয়েছে। ইসাক, মজনু, রবেল ও আব্দুল মান্নানের বসতবাড়ির একাংশ এখন নদীর দিকে ঝুলে রয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘আমাদের পরিবারের ৪৫ বিঘা জমি কালীগঙ্গার পেটে চলে গেছে। বাধ্য হয়ে অন্যত্র বসবাস করতে হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ভাঙন রোধে স্থায়ী কোনো বাঁধ নির্মাণ করা হয়নি। আমরা দ্রুত স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানাই।’
ঘিওর সদরেও ভাঙনের ঝুঁকি বাড়ছে। নতুন সেতুর পূর্ব পাশে ও কুস্তা শ্মশানঘাট এলাকায় কিছু জিও ব্যাগ ফেলা হলেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। কুস্তা উত্তরপাড়ে প্রায় ১০০ বিঘা ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। কুস্তা তিন রাস্তার মোড় থেকে শ্রীধরনগর পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানেও ভাঙন অব্যাহত রয়েছে।
বালিয়াখোড়া ইউনিয়নে ধলেশ্বরী নদীর ভাঙনে গত পাঁচ বছরে কুশুন্ডা দক্ষিণপাড়া ও উত্তরপাড়া এলাকার প্রায় ৫০টি বসতবাড়ি এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ পাকা সড়ক বিলীন হয়েছে। বর্তমানে আরও অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি ও কয়েক শ বিঘা জমি ঝুঁকিতে রয়েছে।
দুই বছর আগে দেড় বিঘা জমিসহ বসতভিটা হারিয়েছেন তসলিম মিয়া। মাসুদ মিয়া, চাঁন মিয়াসহ অনেকে একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বসতভিটা হারানো রাবেয়া আক্তার ও ফিরোজা খাতুন বলেন, ‘বর্ষা মৌসুম এলেই নদীভাঙন দেখতে অনেকে আসেন, আশ্বাস দেন।
কিন্তু বর্ষা শেষে আর কেউ খোঁজ নেন না। নদীর বুকে আমাদের মাথা গোঁজার শেষ ঠাঁইটুকুও চলে গেছে। আর এখন বর্ষার শেষেও নদী ভাঙছে। আমরা ত্রাণ চাই না, স্থায়ী বাঁধ চাই।’
নদীতীরের বাসিন্দাদের অভিযোগ, অপরিকল্পিতভাবে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হচ্ছে এবং ভাঙনের ঝুঁকি বাড়ছে। প্রশাসন মাঝেমধ্যে অবৈধ ড্রেজিংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান চালালেও পরে আবার তা শুরু হয় বলে তাঁদের দাবি।
নদীতীরের বাসিন্দারা জিও ব্যাগ ও কংক্রিটের ব্লক দিয়ে নদীর তীর রক্ষার পাশাপাশি নাব্য ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। ভাঙন প্রতিরোধে প্রায় ৪৯ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। ‘মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলাধীন পুরাতন ধলেশ্বরী নদীর ঝুঁকিপূর্ণ স্থানসমূহে নদীর তীর প্রতিরক্ষামূলক কাজ’ শীর্ষক প্রকল্পটি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রকল্প প্রস্তাবনায় ছয়টি ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করে তিনটি স্থায়ী ও তিনটি অস্থায়ী প্রতিরক্ষামূলক কাজের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এসব এলাকায় বসতভিটার পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্মিত চারটি সেতু, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাটবাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৩০০ হেক্টর ফসলি জমি, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও যোগাযোগব্যবস্থা রক্ষা করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টদের আশা। মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ আক্তারুজ্জামান বলেন, ঘিওর উপজেলার পুরাতন ধলেশ্বরী নদীর ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে তীর প্রতিরক্ষামূলক কাজের প্রকল্পটি বর্তমানে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। অনুমোদন ও বরাদ্দ পাওয়া গেলে ঘিওরের বড় একটি অংশ নদীভাঙন থেকে রক্ষা পাবে।
প্রকল্পের অনুমোদন ও বাস্তবায়নে বিলম্ব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। শুকনো মৌসুমেই দ্রুত কাজ শুরু না হলে পরবর্তী বর্ষার আগেই নতুন করে বসতভিটা, ফসলি জমি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হারানোর আশঙ্কা রয়েছে বলে তাঁদের দাবি।