থানা থেকে অল্প দূরত্বে দোকানে চুরি, বিভিন্ন ইউনিয়নে বাড়িঘরে সিঁধ কেটে নগদ অর্থ, স্বর্ণালঙ্কার ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র লুট; আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বাড়ছে জনমনে উদ্বেগ।
সাইফুল ইসলাম, বাবুগঞ্জ (বরিশাল) প্রতিনিধি: বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলায় চলতি জুলাই মাসজুড়ে একের পর এক চুরি ও ডাকাতির ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও উদ্বেগ বেড়েছে। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে সংঘটিত এসব ঘটনায় নগদ অর্থ, স্বর্ণালঙ্কার, মূল্যবান মালামাল এমনকি গুরুত্বপূর্ণ জমিজমার দলিল পর্যন্ত চুরি হয়েছে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, রাতের অন্ধকারে সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে পুলিশ বলছে, বর্ষাকালে বিচ্ছিন্নভাবে এমন ঘটনা বাড়লেও জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ঘটনার ধারাবাহিকতা
২৬ জুলাই গভীর রাতে বাবুগঞ্জ কলেজ গেট এলাকার খান স্টোরস নামে একটি মুদি দোকানে টিনের চাল কেটে প্রবেশ করে দুর্বৃত্তরা। তারা ক্যাশ কাউন্টার ভেঙে নগদ অর্থসহ প্রায় অর্ধলক্ষাধিক টাকার মালামাল নিয়ে পালিয়ে যায়। দোকানের মালিক মোশারফ হোসেন খান বলেন,
বাবুগঞ্জ থানার মাত্র কয়েকশ গজের মধ্যে এমন ঘটনা সত্যিই উদ্বেগজনক। আমরা ব্যবসায়ীরা এখন আতঙ্কে আছি।
এর আগে ১৯ জুলাই রাত তিনটার দিকে কেদারপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ ভুতেরদিয়া নতুন চর এলাকায় সুমন হাওলাদারের বাড়িতে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, ডাকাতরা নগদ অর্থ, স্বর্ণালঙ্কারসহ তিন লক্ষাধিক টাকার মালামাল লুট করে।
২৪ জুলাই গভীর রাতে উপজেলার দক্ষিণ রাকুদিয়া গ্রামের মনির তামিদার, কবির তামিদার, কালাম হাওলাদার ও রুবেল মল্লিকের বাড়িতে সিঁধ কেটে প্রবেশ করে দুর্বৃত্তরা। পরে তারা নগদ অর্থ, স্বর্ণালঙ্কার ও অন্যান্য মূল্যবান মালামাল নিয়ে যায়।
চলতি মাসেই কেদারপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের তালুকদার বাড়ি থেকে পুরোনো ও মূল্যবান ঐতিহ্যবাহী সামগ্রী চুরি হয়েছে। ওই সময় বাড়িতে কোনো সদস্য উপস্থিত ছিলেন না।
২৩ জুলাই কেদারপুর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে এক সাবেক সচিবের বাড়ির সামনের সাইক্লোন সেন্টারের পানির ট্যাংকের লোহার ঢাকনা চুরি হয়।
১৭ জুলাই রাতে জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের বাসিন্দা ফয়সাল মুন্সির বাড়িতে সিঁধ কেটে দুর্বৃত্তরা নগদ অর্থ ও মূল্যবান মালামাল চুরি করে।
এরও আগে ৯ জুলাই কেদারপুর ইউনিয়নে বিএনপি নেতা কামাল হাওলাদারের ভাই এবং বাবুগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলামের বাড়িতে দুর্ধর্ষ চুরির ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, নগদ অর্থ, মূল্যবান মালামাল এবং গুরুত্বপূর্ণ জমিজমার দলিলসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে যায় চোরেরা।
কী বলছে ঘটনাগুলোর বিশ্লেষণ?
ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করলে কয়েকটি বিষয় স্পষ্টভাবে উঠে আসে ;
অধিকাংশ ঘটনাই গভীর রাতে সংঘটিত হয়েছে।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সিঁধ কেটে বা টিনের চাল কেটে ঘরে বা দোকানে প্রবেশ করা হয়েছে।
নগদ অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কারের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ দলিলপত্রও চুরি হয়েছে।
একই মাসে উপজেলার একাধিক ইউনিয়নে একই ধরনের কৌশলে চুরির ঘটনা ঘটেছে, যা সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় থাকার ইঙ্গিত দিতে পারে।
স্থানীয়দের মতে, বর্ষাকালে রাতের নির্জনতা এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে।
তবে ঘটনাগুলোর মধ্যে মিল থাকলেও সব অপরাধ একই চক্রের মাধ্যমে সংঘটিত হয়েছে কি না, তা তদন্ত শেষ হওয়ার আগে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
পুলিশের বক্তব্য
বাবুগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান হাওলাদার বলেন, ইদানীং বর্ষাকাল হওয়ার কারণে কিছু এলাকায় চুরির ঘটনা ঘটছে। সারাদেশেই বিচ্ছিন্নভাবে এমন ঘটনা হচ্ছে। প্রতিটি ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের গ্রেপ্তারে আমরা কাজ করছি। আগের চেয়ে পুলিশের তৎপরতা ও রাতের টহল আরও জোরদার করা হয়েছে।
এ বিষয়ে বরিশাল জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আলাউল হাসান বলেন, বাবুগঞ্জে সাম্প্রতিক চুরির ঘটনাগুলো আমরা গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছি। প্রতিটি ঘটনার তদন্ত করে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনার জন্য পুলিশ কাজ করছে। ইতোমধ্যে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন এবং রাতের টহল জোরদার করা হয়েছে। জনগণের জানমাল রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
প্রশাসনের বক্তব্য
বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসমা উল হুসনা বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে উপজেলা প্রশাসন পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। চুরি-ডাকাতির ঘটনাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সাংবাদিকদের পর্যবেক্ষণ
বাবুগঞ্জ উপজেলা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও সিনিয়র সাংবাদিক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন,
এক মাসে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন ইউনিয়নে চুরি ও ডাকাতির ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত ও বিচারের আওতায় আনার পাশাপাশি রাতের টহল আরও জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে এলাকাভিত্তিক কমিউনিটি পুলিশিং ও জনসচেতনতা বাড়ানোও সময়ের দাবি।
বাবুগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব ওয়াহিদুল ইসলাম প্রিন্স বলেন, সাম্প্রতিক চুরি ও ডাকাতির ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আমরা আশা করি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনবে এবং নিয়মিত টহল ও নজরদারি আরও জোরদার করবে, যাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ ফিরে আসে।
জনমনে বাড়ছে উদ্বেগ
একের পর এক চুরি ও ডাকাতির ঘটনায় বাবুগঞ্জের সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে গ্রামীণ জনপদের বাসিন্দারা রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন, অনেকেই বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন। তাদের দাবি, দ্রুত অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে জনমনে বিরাজমান আতঙ্ক আরও বাড়বে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, পুলিশের নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি এবং প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে বাবুগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।