নিজস্ব প্রতিবেদক : চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অফিস চলাকালীন সময়ে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকে আন্দোলনে জড়ালে কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক)। শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) দুপুরে গণমাধ্যমে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে এই নির্দেশনার কথা জানানো হয়।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (প্রশাসন) ওমর ফারুকের স্বাক্ষরিত এক দপ্তরাদেশে জানানো হয়, গত ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখ বেলা ১১টা ৩০ মিনিটে, অফিস চলাকালীন সময়ে চট্টগ্রাম বন্দরের কিছু কর্মচারী বন্দর ভবন, ফয়ার এবং বন্দর ভবনসংলগ্ন এলাকায় মিছিল ও সমাবেশে অংশ নেন। এ সময় তারা মহামান্য হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে বিরূপ মন্তব্য করেন এবং রায়ের বিরোধিতা করে বক্তব্য দেন, যা দাপ্তরিক শৃঙ্খলা ও শালীনতার পরিপন্থি।
দপ্তরাদেশে আরও উল্লেখ করা হয়, সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা তাদের এই বেআইনি কর্মকাণ্ডের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করেন এবং প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় বক্তব্য প্রদান করেন। এসব কর্মকাণ্ড চট্টগ্রাম বন্দর কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালা-১৯৯১ অনুযায়ী সুস্পষ্ট অসদাচরণ হিসেবে বিবেচিত। একই সঙ্গে সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলন, মিটিং-মিছিল ও গণমাধ্যমে বক্তব্য প্রদান করা প্রবিধানমালার ৩৮ ধারার ২(ক ও খ), ৩৮(৪) ও ৩৮(৬) অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
দপ্তরাদেশে বলা হয়, এনসিটি সংক্রান্ত রিট মামলায় আদালত সরকারের চুক্তি প্রক্রিয়াকে বৈধ ঘোষণা করেছেন এবং বিষয়টি আদালতের এখতিয়ারাধীন। এ অবস্থায় আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো ধরনের আন্দোলন, বক্তব্য বা কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বিরত থাকার জন্য কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অন্যথায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এতে আরও উল্লেখ করা হয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখের স্মারক অনুযায়ী সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা-১৯৭৯ এর ৩০ নম্বর বিধিসহ সংশ্লিষ্ট আইন যথাযথভাবে অনুসরণের নির্দেশনা রয়েছে। এর আগে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে একাধিকবার চট্টগ্রাম বন্দরের অভ্যন্তরীণ বিষয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ না করা, গোপনীয় নথি প্রকাশে বিরত থাকা এবং অফিস সময় যথাযথভাবে অনুসরণের বিষয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও কিছু কর্মচারী ওই নির্দেশনা অমান্য করেছেন।
দপ্তরাদেশে বলা হয়, উপরোক্ত কর্মকাণ্ড কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অমান্য, অসদাচরণ এবং অনানুগত্যের শামিল। ফলে অভিযুক্ত কর্মচারীদের বিরুদ্ধে সরকারি চাকরি আইন-২০১৮, চট্টগ্রাম বন্দর কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালা-১৯৯১ এর ৩৯ ধারা এবং সরকারি কর্মচারী (নিয়মিত উপস্থিতি) বিধিমালা-২০১৯ অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় প্রধানদের নির্দেশক্রমে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দাপ্তরিক শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে।
এদিকে, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এননিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া শ্রমিক-কর্মচারীদের আন্দোলন কর্মসূচি শুরুর আগ মুহূর্তে এ ঘোষণা এসেছে।
উল্লেখ্য এনসিটি ইজারা দিয়ে আরব-আমিরাতভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সরকার চুক্তি করতে যাচ্ছে, এমন তথ্যের ভিত্তিতে গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম বন্দর ভবনে বিএনপিপন্থি দুই সংগঠনের শ্রমিক-কর্মচারীরা বিক্ষোভ করেন। প্রথমে তারা বন্দর ভবনের সামনে থেকে মিছিল শুরু করেন। মিছিলটি বন্দর ভবন চত্বরে ঘুরে একপর্যায়ে প্রশাসনিক ভবনের ভেতরে প্রবেশ করে। বন্দর চেয়ারম্যানের কক্ষের সামনে তারা বিক্ষোভ করেন। বিক্ষোভের পর বিকেলের দিকে বন্দর ভবনের ফটকের সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
ওইদিন পৃথক সংবাদ সম্মেলন করে এনসিটি বিদেশিদের কাছে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধের দাবিতে ধর্মঘটের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল এবং চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সাবেক সিবিএ।
ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, আজ শনিবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরের সমস্ত অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ রেখে সর্বাত্মক ধর্মঘট পালন করা হবে। একইভাবে পরদিন রোববার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরে সব ধরনের প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। রোববার বিকেল ৫টায় আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে জানানো হয়।
শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) ধর্মঘটের প্রতি সর্বাত্মক সমর্থন ও পূর্ণ সহযোগিতা ঘোষণা করেছে। একইসঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের সকল শ্রমিক-কর্মচারীদের এ কর্মসূচিতে একাত্ম হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে স্কপ। এ ছাড়া স্কপের পক্ষ থেকে ১ ফেব্রুয়ারি (কাল) বেলা ১১টায় চট্টগ্রাম বন্দর ভবন অভিমুখে কালো পতাকা মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।