অনলাইন ডেস্ক : শিল্প এলাকা গাজীপুর-১ আসন। এখানকার প্রায় ৪৩ শতাংশ ভোটার শিল্প-কারখানার শ্রমিক। লম্বা কোনো ছুটি পেলেই গ্রামের বাড়িতে চলে যান তারা। সাধারণত ঈদ উৎসবে এমনটি ঘটে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে চার দিন ছুটি পাচ্ছেন তারা। ১০ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছুটি কাটাতে বাড়িতে চলে গেলে ভোটকেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই ক্ষেত্রে ভোটের হিসাব পাল্টে যাবে।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে একজন জামায়াত নেতা জানান, শ্রমিকদের মধ্যে জামায়াতপন্থি অনেক ভোট রয়েছে। শ্রমিকরা ভোট না দিয়ে যদি গ্রামের বাড়ি চলে যায় তাহলে জামায়াত প্রার্থী ভোটে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বলে মনে করেন তিনি।
কালিয়াকৈর পৌর শ্রমিক দলের সভাপতি একে আজাদ বলেন, বিএনপি প্রার্থী মজিবুর রহমানের নেতৃত্বে তারা প্রতিটি পোশাক কারখানায় গিয়ে শ্রমিকদের বোঝাচ্ছেন যেন ভোট দিয়ে গ্রামের বাড়িতে যান। শ্রমিক ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে নেওয়ার জন্য সব ধরনের চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে শ্রমিক ভোটারদের কেন্দ্রে নিতে না পারলে বিএনপি প্রার্থীর বেশি ব্যবধানে বিজয় নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। তবুও বিএনপি প্রার্থী মজিবুর রহমান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর চেয়ে এক লাখ ভোট বেশি পেয়ে জয় লাভ করবেন বলে প্রত্যাশা তাদের।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গাজীপুর-১ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপি প্রার্থী কালিয়াকৈর পৌরসভার সাবেক মেয়র মজিবুর রহমান, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সাবেক সচিব শাহ আলম বকশি, লেবার পার্টির প্রার্থী চৌধুরী ইরাদ আহমেদ সিদ্দিকী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মাওলানা রুহুল আমিন, জাতীয় পার্টির প্রার্থী এসএম শফিকুল ইসলাম, স্বতন্ত্র প্রার্থী এমারত হোসেন আরিফ, বাসদের (মার্কসবাদী) প্রার্থী তাসলিমা আক্তার, গণফ্রন্টের প্রার্থী আতিকুল ইসলাম।
কালিয়াকৈর-কাশিমপুর, কোনাবাড়ী ও বাসন থানা এলাকা নিয়ে গাজীপুর-১ আসন। এখানকার ভোটার ও উপজেলা নির্বাচন অফিসের তথ্যমতে, গাজীপুর-১ আসন আওয়ামী লীগের দুর্গে পরিণত হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে আসনটি দখলে নেওয়ার চেষ্টা করছেন বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা। এই আসনে ভোটার সংখ্যা সাত লাখ ১৬ হাজার ৪৯৭ জন। যাদের মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৯১ জন শ্রমিক ভোটার। অর্থাৎ মোট ভোটারের প্রায় ৪৩ শতাংশ শিল্পকারখানার শ্রমিক।
শ্রমিক ভোটারদের ওপর নির্ভর করবে জয়-পরাজয়: গাজীপুর-১ আসনের শ্রমিক ভোটাররা জয়-পরাজয়ে ভোটের ব্যবধান গড়ে দেবেন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। অনেকের মতে, এ নির্বাচনে টানা চার দিন ছুটি পাচ্ছেন শ্রমিকরা। এতে তারা গ্রামের বাড়িতে চলে গেলে কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি কম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই ক্ষেত্রে ভোটের হিসাব পাল্টে যাবে। তবে তাদের ভোটকেন্দ্রে আনতে পোশাক কারখানায় গিয়ে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাচ্ছেন প্রার্থীরা।
মালেক স্পিনিং মিলসের শ্রমিক জামাল, আরিফ বলেন, যিনি সাধারণ শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ সড়ক ও মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তুলবেন তাঁকেই ভোট দেবেন শ্রমিকরা।
পূর্ব চান্দরা এলাকার একটি পোশাক কারখানার শ্রমিক নুসরাত জাহান, শেফালী বেগম, চায়না জানান, যিনি তাদের সড়কে অবাধে চলাচলের ব্যবস্থা করবেন তাঁকেই ভোট দিয়ে সংসদে পাঠাবেন তারা। অনেক সময় কারখানার মালিক বেতন-বোনাস নিয়ে টালবাহানা করে থাকেন। সেসব সমস্যার সমাধানে যিনি এগিয়ে আসবেন তাঁর বাক্সেই ভোট দিতে চান তারা।
কোনাবাড়ী এলাকার এমএম নামক পোশাক কারখানার শ্রমিক জাহিদুল ইসলাম ও কালিয়াকৈরের ট্রপিস্টার নামক পোশাক কারখানার শ্রমিক জাহাঙ্গীর আলম, সরভানু বেগম, চায়না রানীর ভাষ্য, এখানে ভোট দিয়ে কোনো লাভ নেই। তাই গ্রামের বাড়ি চলে যাবেন তারা। সেখানে কিছু কাজ আছে। কেন এখানে ভোটার হয়েছেন? এই প্রশ্নের জবাবে শ্রমিকরা জানান, ভোটার আইডি কার্ড ছাড়া চাকরি পাওয়া যায় না। তাই তড়িঘড়ি করে এখানেই ভোটার হয়েছেন।
নীজ ফ্যাশন লিমিটেড নামক পোশাক কারখানার শ্রমিক ইউনুছ আলী, আলেয়া বেগম, সুমিতা বলেন, এখানে ভোটার হলেও কোনো দিন ভোট দিতে যাননি তারা। কেউ তাদের কাছে ভোট চান না।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স ট্রেড ইউনিয়ন গাজীপুর শাখার সভাপতি আমিনুল ইসলামের ভাষ্য, গাজীপুর-১ আসনে তিন লাখের বেশি ভাসমান শ্রমিক ভোটার রয়েছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শ্রমিকরা চার দিন ছুটি পাওয়ায় ঈদ উৎসবের মতো গাড়ি ভাড়া করে গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। এমন হলে প্রার্থীদের ভোটের হিসাব পাল্টে যাবে। তবে বিভিন্ন দলের প্রার্থী ও নেতাকর্মীরা শ্রমিকদের বুঝিয়ে ভোটকেন্দ্রে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
প্রচারে মুখর এই সংসদীয় এলাকা:
প্রতীক বরাদ্দের দিন থেকেই বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মীরা সভা-সমাবেশ করে যাচ্ছেন। অনেক নির্বাচনী সভায় একে অপরকে ঘায়েল করার জন্য নানা ভাষায় বক্তব্যও দিচ্ছেন। জামায়াতে ইসলামীর কর্মী-সমর্থকরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে নারী ভোটারদের কাছে ভোট প্রার্থনা করছেন। বিএনপি প্রার্থীর কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচারপত্র বিলি করছেন। প্রতিদিনই প্রার্থীদের পক্ষে মিছিল করতে দেখা গেছে। দুপুরের পর থেকেই মাইকিং করা হচ্ছে। প্রার্থীদের প্রচারে উৎসব মুখর হয়ে উঠেছে এই সংসদীয় এলাকা।
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী শাহ আলমের ভাষ্য, এবার গাজীপুর-১ আসনে বিজয় অর্জন করতে পারলে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা হবে। চাঁদাবাজি, জমি দখল বন্ধ বরা হবে। যে এলাকায় বেশি সমস্যা, সেই অঞ্চলে আগে উন্নয়ন করা হবে।
বিএনপি প্রার্থী মজিবুর রহমান বলেন, ‘আমি ২০ বছর পৌরসভার মেয়র থাকাকালীন মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে ছিলাম। এবার এই আসনে বিজয় অর্জন করলে সর্বদা সাধারণ মানুষের পাশে থেকে সেবা করব।
স্থানীয়দের অভিমত, বিগত সংসদ নির্বাচনে গাজীপুর-১ আসনে বিজয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগের ভাড়াটিয়া প্রার্থী। এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি, জামায়াতসহ অধিকাংশ প্রার্থীর বাড়ি কালিয়াকৈর উপজেলায়। তাই এবারের নির্বাচনে সাধারণ মানুষ ও ভোটাররা সংসদ সদস্য পাবেন স্থানীয় কোনো প্রার্থীকে।
উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আনোয়ারুল ইসলাম জানান, গাজীপুর-১ আসনে হাজারের ওপর পোশাক কারখানাসহ বিভিন্ন শিল্পকারখানা রয়েছে। কর্মরত এলাকায়ই ভোটার হয়েছেন শ্রমিকরা। এই আসনে শ্রমিক ভোটারের সংখ্যা ৪৩ শতাংশের ওপরে। কয়েক দিন ছুটি পেলেই এসব শ্রমিক নিজেদের গ্রামের বাড়িতে চলে যান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে চার দিনের ছুটি পাচ্ছেন তারা। ফলে ভোটকেন্দ্রে ভাসমান ভোটারের উপস্থিতি কম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।