নিজস্ব প্রতিবেদক : দীর্ঘ অনাবৃষ্টি সহ তাপপ্রবাহে ফরিদপুর-বরিশাল-পটুয়াখালী-কুয়াকাটা/বরগুনা জাতীয় মহাসড়কের ক্ষতির পরে বৈশাখের লাগাতার অগ্রিম বর্ষণে পরিস্থিতি আরো নাজুক করে তুলছে। অথচ সারা দেশের সাথে বিভাগীয় সদর বরিশাল সহ পুরো এ অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা এই ৮ নম্বর জাতীয় মহাসড়কটির ওপরই নির্ভরশীল।
তাই আসন্ন ঈদ উল আজহার আগে পরে যে প্রায় ১০ লাখ মানুষ ঘরে ফিরবেন এবং কর্মস্থলে ফিরে যাবেন, তাদের নির্বিঘ্ন পরিবহনে এ মহাসড়কটিতে ভোগান্তি কোন পর্যায়ে যাবে, তা নিয়ে শঙ্কিত সড়ক অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল মহল সহ পরিবহন মালিক-শ্রমিকগণও। এমনকি এ মহাসড়কে দুর্ঘটনার সংখ্যাও ক্রমশ বাড়ছে। বাড়ছে জানমালের ক্ষতির পরিধিও।
দীর্ঘদিনের যথাযথ নজরদারি সহ পরিপূর্ণ মেরামতের অভাবে এ মহাসড়কটির অবস্থা ক্রমে নাজুক আকার ধারণ করছে। প্রায় ৮ বছর ধরে পদ্মা সেতু এবং সংযুক্ত ভাঙা–ঢাকা এক্সপ্রেসওয়ে নির্মিত হলেও তার সুফল পেতে ভাঙা থেকে বরিশাল সহ সমগ্র দক্ষিণাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা উন্নয়ন সহ আধুনিকায়নের কথা ভাবেনি সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়।
১৯৬০-৬৬ সালের মধ্যে ৫ টন ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন ১২ ফুট প্রশস্ত এ মহাসড়কটি নির্মিত হবার পরে বিগত ৬০ বছরেও পূর্ণাঙ্গ কোনো মেরামত সহ এর পরিপূর্ণ উন্নয়ন ও সংস্কার হয়নি। এমনকি ২০১৫ সালে এ মহাসড়কটি ৬ লেনে উন্নীতকরণে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরে এডিবি’র অর্থে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সহ পথ নকশা তৈরি হলেও গত এক দশকেরও বেশি সময়ে আর কোনো অগ্রগতি নেই। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ভূমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ হবার কথা ২০২১-এর ৩০ জুন। কিন্তু ১,৮৫৪ কোটি টাকার ভূমি অধিগ্রহণে এখন প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে বিধায় বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার বরিশাল পর্যন্ত মহাসড়কটি উন্নয়নের পাশাপাশি বাইপাস নির্মাণও বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রদান করলেও আর কোনো অগ্রগতি হয়নি। আগামী ৩০ জুনের মধ্যে এ মহাসড়কের ভূমি অধিগ্রহণে বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা হচ্ছে না বলেই জানা গেছে।
২০২২ সালে পদ্মা সেতু চালু হবার পরে বরিশাল-ফরিদপুর ও বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কে যানবাহনের চলাচল অন্তত তিনগুণ বেড়েছে। কিন্তু গত ৬১ বছরে মহাসড়কটি ১২ ফুট থেকে অনেক কালক্ষেপণের পরে ২৪ ফুট প্রশস্ত হলেও বার বার ওভার-লে সহ জোড়াতালি দিয়েই যানবাহন চলাচল করছে।
এমনকি পদ্মা সেতু চালু হবার আগেই পায়রা সমুদ্র বন্দর পরিচালনায় আসায় সেখান থেকে প্রতিনিয়ত লং ভেহিকেলে বিশাল আকৃতির কন্টেইনার এ মহাসড়ক দিয়েই ঢাকা সহ সারাদেশে যাতায়াত করছে। ফলে অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে ৫ টন ধারণ ক্ষমতার এ মহাসড়কে এখন ৩৫-৪০ টন পণ্য পরিবহন হচ্ছে।
লাগাতার অতিরিক্ত তাপ ও চাপে এ মহাসড়কটির দুর্দশাও ক্রমশ তড়ান্বিত হচ্ছে। সাথে যথাযথ মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে সরকারি উদাসীনতা পরিস্থিতিকে আরো নাজুক করে তুলছে। বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দক্ষিণাঞ্চলের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ এ জাতীয় মহাসড়কটির উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে দীর্ঘ কালক্ষেপণ করায় এর ভঙ্গুর অবস্থা ভয়াবহ রূপ লাভ করেছে। যার ফল ভোগ করতে হয়েছে বিগত ঈদ উল ফিতরের সময়। আসন্ন ঈদ উল আজহাতেও তার ব্যতিক্রম হবে না বলেও মনে করছেন পরিবহন মালিক ও শ্রমিকগণ।
উপরন্তু এবার লাগাতার অনাবৃষ্টি ও স্বাভাবিকের চেয়ে তাপমাত্রার পারদ ৪-৫ ডিগ্রী পর্যন্ত ওপরে উঠে যাওয়ায় মহাসড়কটির বিটুমিনাস কার্পেটিং যেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তেমনি আগাম লাগাতার অতি বর্ষণে পরিস্থিতি আরো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার এ মহাসড়কটির মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে দরপ্রস্তাবসমূহ অনুমোদনে বছরেরও বেশি কালক্ষেপণ করে। ফলে মহাসড়কটির সময়মত ও যথাযথ মেরামত এবং রক্ষণাবেক্ষণ হয়নি। ফলে ক্ষতির পরিধি আরো বেড়েছে।
এমনকি সদ্য বিদায়ী সরকারের উদাসীনতা ও অবহেলায় দক্ষিণাঞ্চলের প্রবেশদ্বার এ মহাসড়কটিকে ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে ফেলেছে বলেও মনে করছে পরিবহন বিশেষজ্ঞগণ।
ফলে ঢাকা থেকে ৬৫ কিলোমিটার এক্সপ্রেসওয়ে পাড়ি দিয়ে ভাঙা পৌঁছতে যেখানে ৫০-৫৫ মিনিট সময় লাগছে, সেখানে ৯১ কিলোমিটার দক্ষিণে বরিশাল পৌঁছতে ৩ থেকে সাড়ে ৩ ঘণ্টা লেগে যাচ্ছে। অপ্রশস্ত, ভঙ্গুর ও উঁচু-নিচু এ মহাসড়কে আসন্ন ঈদ উল আজহাতে দক্ষিণাঞ্চলের ৬টি জেলা ও ৪২টি উপজেলার মানুষের ভোগান্তি কোন পর্যায়ে নিয়ে যাবে তা নিয়েও ইতোমধ্যে শঙ্কিত সবাই।
অপরদিকে এ মহাসড়কটি ৬ লেনে উন্নীতকরণে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে ১০ বছর অতিক্রমের পরে বাস্তব কাজ শুরু হতে আরো কত বছর অপেক্ষা করতে হবে, সড়ক অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছেও তা অজ্ঞাত। অর্থ বরাদ্দের পরে ৭ বছর অতিক্রম হলেও এ মহাসড়ক উন্নয়নে ভূমি অধিগ্রহণের কাজটিও শেষ না হওয়ায় হতাশ সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ। এমনকি দাতা প্রতিষ্ঠানের চাহিদার দু বছর পরেও নতুন ‘পথ নকশা’ সহ ‘প্রকল্প-সারপত্র’ এবং ‘দরপত্র দলিল’ তৈরির কাজেও মনোনিবেশ করতে পারেনি সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর।