নিজস্ব প্রতিবেদক : গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার কুশলা ইউনিয়নের চৌরখুলী মধ্যপাড়া গ্রামটি কৃষি ও মৎস্য উৎপাদনে সমৃদ্ধ হলেও নেই ন্যূনতম যাতায়াত ব্যবস্থা। প্রায় দুই হাজার হেক্টর কৃষিজমিতে ধান, পাট, গম, সরিষা, খেসারি ও মসুরসহ বিভিন্ন ফসলের চাষ হয়। পাশাপাশি পুকুর ও ঘেরে উৎপাদিত হয় বিপুল পরিমাণ মাছ। গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগির খামারও রয়েছে গ্রামটিতে। বছরে প্রায় ১০ কোটি টাকার কৃষিপণ্য উৎপাদিত হলেও রাস্তার অভাবে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয়রা।
গ্রামটিতে প্রায় ২৫০টি পরিবারের বসবাস। তবে এসব পরিবারের সহস্রাধিক মানুষের চলাচলের জন্য নেই কোনো সড়ক। ফলে কৃষিপণ্য পরিবহন থেকে শুরু করে শিক্ষা, চিকিৎসা, সামাজিক ও ধর্মীয় কার্যক্রম সব ক্ষেত্রেই চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে গ্রামবাসীকে।
চৌরখুলী মধ্যপাড়া গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে শৈলদহ নদী এবং ছোট-বড় তিনটি খাল। এসব নদী-খালের পানি গ্রামটিকে করেছে উর্বর ও শস্যশ্যামল। সবুজ প্রকৃতিতে ঘেরা গ্রামটিতে রয়েছে মসজিদ, মাদ্রাসা, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও গির্জা। কিন্তু এত কিছুর পরও যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে যেন উন্নয়নের বাইরে পড়ে আছে পুরো জনপদ।
দুর্ভোগ নিরসনে গ্রামবাসীর পক্ষ থেকে একটি রাস্তা নির্মাণের দাবিতে গত বৃহস্পতিবার কোটালীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত আবেদন করা হয়েছে।
আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কুশলা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মূল সড়ক মনিরুজ্জামান সুপার মার্কেট থেকে দক্ষিণ চৌরখুলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত রয়েছে। এরপর শুরু হয়েছে মধ্যপাড়া গ্রাম, যেখানে যাতায়াতের কোনো রাস্তা নেই। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি, কাদা ও জলাবদ্ধতার মধ্যে বসবাস করতে হয় এলাকাবাসীকে। অনেক পরিবার তখন নৌকায় চলাচল করতে বাধ্য হয়।
গ্রামবাসীর অভিযোগ, রাস্তা না থাকায় স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। শিশুদের স্কুলে যাতায়াতেও তৈরি হচ্ছে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা। এছাড়া কৃষিপণ্য বাজারজাত করতে না পারায় উৎপাদিত পণ্য কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
গ্রামের বাসিন্দা ফরহাদ মোল্লা ও হাবিবুর রহমান মোল্লা বলেন, “আমাদের গ্রামে বছরে প্রায় ১০ কোটি টাকার কৃষিপণ্য, মাছ ও গবাদিপশু উৎপাদিত হয়। কিন্তু রাস্তা না থাকায় বাজারে ঠিকমতো নিতে পারি না। ফলে পানির দামে পণ্য বিক্রি করতে হয়। আশপাশের সব গ্রামে রাস্তা হয়েছে, শুধু আমাদের গ্রামই অবহেলিত রয়ে গেছে।”
তারা আরও বলেন, “উৎপাদিত পণ্য মাথায় করে বহন করতে হয়। সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানেও চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। মুমূর্ষু রোগী পরিবহনের সময় কষ্টের শেষ থাকে না। দ্রুত রাস্তা নির্মাণ করা হলে গ্রামের কৃষি ও অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।”
চৌরখুলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী শামীম শেখ জানায়, জমির আইল ও বিভিন্ন বাড়ির ওপর দিয়ে স্কুলে যেতে হয়। বৃষ্টি হলে কাদা জমে যায়। অনেক সময় হোঁচট খেয়ে পড়ে যেতে হয়। বর্ষাকালে আইল তলিয়ে গেলে কাদা-পানি ভেঙে স্কুলে যেতে হয়। এতে বই-খাতা ও পোশাক নষ্ট হয়ে যায়।
গ্রামের এনায়েত মোল্লা বলেন, “মাত্র এক কিলোমিটার রাস্তা হলেই আমাদের দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান হবে। রাস্তার জন্য কয়েকজন জমিও দিতে রাজি হয়েছেন। জমি নিয়ে কোনো বিরোধ নেই। রাস্তা হলে জমির দামও বাড়বে।”
কোটালীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাগুফতা হক বলেন, আবেদনটি পর্যালোচনা করে রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। তিনি আরও বলেন, রাস্তার জমি নিয়ে কোনো জটিলতা না থাকলে কাজ বাস্তবায়ন সহজ হবে। তবে গ্রামবাসীর যাতায়াত সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রশাসন আন্তরিক রয়েছে।