নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল: বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন ৯০ বছরের আজিজুল রহমান। অসুস্থ শরীর নিয়ে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছেন তিনি। পাশে বসে সারাক্ষণ স্বামীর দেখভাল করছেন ৮০ বছরের স্ত্রী মাজেদা বেগম। নিজের শরীরও ভালো নয়, তবু স্বামীর চিকিৎসার জন্য হাসপাতালের এদিক-ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছেন তিনি।
গাইবান্ধা সদর উপজেলার বল্লমঝাড় ইউনিয়নের মোড়লপাড়ার এই বৃদ্ধ দম্পতির জীবন কাটে একটি আধাভাঙা টিনের ঘরে। একসময় দিনমজুরি করে সংসার চালাতেন আজিজুল রহমান। বয়সের ভারে এখন আর কাজ করার সামর্থ্য নেই।
জীবনের শেষ সম্বল বলতে ছিল মাত্র চার শতাংশ বসতভিটার জমি। অভিযোগ, সেই জমিটুকুও নাতি নিশান কৌশলে লিখে নিয়েছেন। ফলে মাথা গোঁজার ঠাঁই নিয়েও অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তারা।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, আজিজুল রহমানের দুই মেয়ে ও এক ছেলে। ছেলে ময়নুল রিকশা চালিয়ে নিজের সংসার চালান। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের তেমন খোঁজখবর রাখেন না বলে অভিযোগ পরিবারের। এক মেয়ে স্বামী পরিত্যক্তা। তিনি অন্যের বাড়িতে কাজ করে নিজের সংসার চালানোর পাশাপাশি যতটা সম্ভব বাবা-মায়ের দেখভাল করেন।
এরই মধ্যে তিন দিন আগে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন আজিজুল রহমান। অসুস্থ হলেও তাকে হাসপাতালে নেওয়ার মতো পাশে ছিলেন না কেউ। শেষ পর্যন্ত ৮০ বছরের মাজেদা বেগম কোনো রকমে স্বামীকে নিয়ে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের গেটে পৌঁছান।
সেখানে স্বামীর চিকিৎসার জন্য মানুষের কাছে সাহায্যের আকুতি জানাতে থাকেন তিনি। কখনো চোখের পানি মুছছিলেন, আবার কখনো অসহায়ের মতো পথচারীদের দিকে তাকিয়ে স্বামীর চিকিৎসায় সহযোগিতা চাইছিলেন।
এ সময় হাসপাতাল থেকে বের হচ্ছিলেন সোহেল রানা নামে এক যুবক। বৃদ্ধার কান্না দেখে থেমে যান তিনি। জানতে পারেন তাদের অসহায়ত্বের কথা। পরে আর দেরি না করে নিজের উদ্যোগে আজিজুল রহমানকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে ভর্তি করানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ওষুধও কিনে দেন সোহেল।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আজিজুল রহমানের দিন কাটছে শারীরিক কষ্টে। আর তার পাশে ছায়ার মতো রয়েছেন স্ত্রী মাজেদা বেগম। বয়সের ভারে তিনিও নুয়ে পড়েছেন। তবু স্বামীর জন্য যেন তার ক্লান্তি নেই।
আজিজুল রহমান বলেন, জীবনের শেষ সময়ে এসে তিনি অসহায় হয়ে পড়েছেন। নিজের বলতে তেমন কিছুই নেই। অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসা পাওয়াটাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্ত্রী মাজেদা বেগম বলেন, স্বামী অসুস্থ হওয়ার পর তাকে নিয়ে খুব কষ্টে হাসপাতালে এসেছেন। স্বামীর চিকিৎসা করানোর মতো সামর্থ্য তাদের নেই। মানুষের সহযোগিতাই এখন তাদের ভরসা।
এ বিষয়ে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. আসিফ উর রহমান জানান, বয়সজনিত কারণে প্রস্রাবের সমস্যাসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় আজিজুল রহমান হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। চিকিৎসকরা তার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিচ্ছেন এবং নিয়মিত খোঁজখবর রাখছেন।
এদিকে, বৃদ্ধ দম্পতির যথাযথ দেখভাল না করা এবং তাদের চার শতাংশ জমি লিখে নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে নাতি নিশানের বাড়িতে যান প্রতিবেদক। তবে তাকে বাড়িতে পাওয়া যায়নি। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো এই বৃদ্ধ দম্পতি এখনো কোনো বয়স্ক বা দুস্থ ভাতা পান না বলে জানা গেছে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাদের চাওয়া-পাওয়াও খুব বেশি নয়। দুবেলা খাবার, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, মাথা গোঁজার একটি নিরাপদ ঠাঁই আর আপনজনের সামান্য মমতাই তাদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
যে মানুষটি সারাজীবন পরিশ্রম করে সন্তানদের বড় করেছেন, জীবনের শেষ সময়ে সেই মানুষটির চিকিৎসার জন্য ৮০ বছরের স্ত্রীকে হাসপাতালের গেটে দাঁড়িয়ে মানুষের কাছে হাত পাততে হচ্ছে এর চেয়ে বেদনাদায়ক দৃশ্য আর কী হতে পারে?
আজিজুল রহমান ও মাজেদা বেগমের গল্পটি শুধু একটি বৃদ্ধ দম্পতির অসহায়ত্বের গল্প নয়; এটি আমাদের পরিবার ও সমাজের মানবিকতার প্রতিচ্ছবিও। শেষ বয়সে মানুষ যেন অবহেলার নয়, বরং নিরাপত্তা, চিকিৎসা ও আপনজনের ভালোবাসার আশ্রয় পান এটাই প্রত্যাশা।